২ কোটি ২০ লাখ মানুষের মৃত্যুর পর শেষ হলো করোনা মহামারির জরুরি অবস্থা। গত শুক্রবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯ বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থার সমাপ্তি ঘোষণা করেছে। আগামী সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হবে। কয়েক বছর ধরে করোনা মহামারিতে মৃত্যু ও অসুস্থ হওয়ার ঘটনায় হতাশ আমেরিকানরা এখন নিজেদের জিজ্ঞেস করছেন, এটি কখন শেষ হবে? আনুষ্ঠানিকভাবে এটি এখনই শেষ হওয়া উচিত, যদিও তা যতই নির্বিচার মনে করা হোক না কেন।
আমরা কীভাবে এই সফলতা অর্জন করলাম? ২০২০ সালে আমরা ‘বক্ররেখা সমতল করা’ এবং ‘শূন্য কোভিড’ সম্পর্কে কথা বলেছিলাম। আমরা কল্পনা করলাম, শিগিগরই এর খেল খতম হবে। আমরা স্প্যানিশ ফ্লুর তরঙ্গ লেখচিত্রের দিকে তাকালাম এবং ভাবলাম এরকম কতগুলো তরঙ্গ আমাদের আরো সহ্য করতে হবে:এটি কি এক বা দুটি শীতকালের ঢেউ হবে? আমরা হার্ড ইমিউনিটি সম্পর্কে ফিসফিস করলাম এবং আমাদের জীবন থেকে এই রোগ সত্যিকার অর্থে সরে যাওয়ার আগে আরো কতজনকে তা সংক্রমিত করবে তা নির্ধারণ করার চেষ্টা করলাম:৬০ শতাংশ? ৭০ শতাংশ? ৯০ শতাংশ? যখন করোনার ভ্যাকসিনগুলো হাসপাতালে হাসপাতালে পৌঁছাতে শুরু করল, তখন পর্যন্ত কেউ কল্পনাও করেননি যে, এত দ্রুত করোনার টিকা আবিষ্কার করা সম্ভব হবে।
ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। আর এই ইচ্ছাপূরণের চিন্তাভাবনা থেকেই এরূপ আবিষ্কার ও সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। আমরা করোনার নতুন নতুন ভেরিয়েন্ট দেখতে পেলাম। বিশেষ করে যেগুলো বেশি সংক্রমণযোগ্য এবং ইমিউনিটি এড়াতে আরো কার্যকর। যদিও আমরা সেই অলৌকিক ভ্যাকসিনগুলো পেলাম, তার পরও এমন কিছু যুগান্তকারী ঘটনা ঘটল, যা থেকে আমরা শিখতে বাধ্য হলাম। মৃত্যুর পর মৃত্যু, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস এবং সবচেয়ে দুর্বল, বিশেষত বয়স্কদের জন্য স্থায়ী ঝুঁকি সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু শিখলাম।
শেষ পর্যন্ত এই বিস্ময়গুলো মহামারির শুরুতে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের করা কিছু ভয়ংকর অনুমানকে বৈধতা দান করল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ড. অ্যান্টনি ফৌসি ১০ লাখ আমেরিকান মৃত্যুর মতো সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। আজ আমরা দেখছি, আমেরিকায় করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা ১১ লাখ অতিক্রম করেছে। ব্রিটেনে ডা. নিল ফার্গুসন আড়াই লাখ মৃত্যুর বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। আজ সেখানে মৃত্যুর সংখ্যা সোয়া ২ লাখের ওপরে।
কিন্তু মহামারি কখন শেষ হবে, কোনো চিকিৎসাবিজ্ঞানী নিশ্চিতভাবে সে ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারলেন না। চিকিৎসা ইতিহাসবিদেরা প্রায় শুরু থেকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন, এটি এমন একটি মহামারি, যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সহজ নয়। এটি মোকাবিলা করতে হলে প্রয়োজন সামাজিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আর সেই সিদ্ধান্ত ও জনসচেতনতার কারণেই আমরা আজ এই অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছি।
কিন্তু এই অবস্থানটা ঠিক কোথায়? আমরা যখন করোনা মহামারির অনুপস্থিতি তথা সমাপ্তি প্রত্যাশা করছি, তখন গত এপ্রিল মাসের দ্য ইকোনমিস্টের এক পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন গড়ে ১১ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যু হচ্ছে। প্রতি বছর অতিরিক্ত মৃত্যু হচ্ছে প্রায় ৪ মিলিয়ন। কোভিড-১৯-এর জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী এই মৃত্যুর অনুপাত ক্রমাগতভাবে সংকুচিত হচ্ছে এবং সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন এরূপ মৃত্যুর সংখ্যা হাজারের নিচে রয়েছে। মার্চ ২০২০ থেকেও এটি সর্বনিম্ন স্তর—যদিও এটা সম্ভবত কম টেস্ট ও নজরদারির ফলাফল।
বিশ্বের অতিরিক্ত মৃত্যুহার কিছুটা ভিন্ন গল্প বলে। গত এক বছরে এটি কিছুটা প্রসারিত হলেও গত কয়েক মাসের ট্রেন্ডলাইন বিশ্বস্তরে অর্থপূর্ণভাবে নিচের দিকে নির্দেশ করছে না। কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া অতিরিক্ত মৃত্যু এখন প্রায় এক বছর ধরে প্রতিদিন ৮ হাজার থেকে ১৫ হাজারের মধ্যে স্থিতিশীল রয়েছে। গত ১২ মাসে বিশ্বব্যাপী চার মিলিয়নেরও বেশি অতিরিক্ত মৃত্যু হয়েছে, যা ২০২০ সালের প্রথম ১১ মাসে অনুমান করা হয়েছিল। গত ছয় মাসে দুই মিলিয়নের বেশি অতিরিক্ত মৃত্যু হয়েছে, যা ২০২০ সালের প্রথম আট মাসের জন্য বিশ্বব্যাপী অনুমান করা হয়েছিল। কিছু সময় আমরা এগুলোকে অতিরিক্ত মৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা বন্ধ করতে পারি এবং এর পরিবর্তে উচ্চতর মৃত্যুহার বেসলাইনে অন্তর্ভুক্ত করতে পারি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মহামারি জরুরি অবস্থার সমাপ্তি ঘোষণা করেছে বিধায় এখন এটি বলা নিরাপদ যে, গ্রহের যে কোনো জায়গায় বসবাসকারী একটি বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কোভিডে আক্রান্ত হয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৯৪ শতাংশ বা তার বেশি জনসাধারণ কমপক্ষে একবার না একবার করোনা সংক্রমণের করুণ অভিজ্ঞতা লাভ করেছে, যা দেশটির কোভিডে মৃত্যুর সরকারি গণনা কেন শেষ পর্যন্ত হ্রাস পাচ্ছে তা ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করতে পারে। অতিরিক্ত মৃত্যুহারের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। কোভিড আমেরিকান জীবন থেকে চলে যায়নি, তবে টিকা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। মহামারির প্রথম বছরে মৃত্যুর শীর্ষ তিনটি কারণের একটি ছিল করোনা। এই বছর এটি মৃত্যুর ১০টি কারণের একটিতে পরিণত হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলো ঠিক পরিষ্কার না হলেও প্রভাবগুলোও সেখানে সংকুচিত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। দ্বিতীয় বার সংক্রমণের হারও নিম্নমুখী, এটা ৪০ শতাংশের কম বা বেশি।
জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি অনুসারে এই শীতকাল পর্যন্ত নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে বসবাসকারী মানুষের মাত্র ২৩ শতাংশকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এবং সেই টিকাগুলোর বেশির ভাগই গত বছর আসে। যখন উচ্চ আয়ের এবং উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ২০২১ সালের শেষের দিকে প্রায় ৭০ শতাংশ টিকা পৌঁছেছিল, তখন নিম্ন আয়ের দেশগুলো তা ৩ শতাংশে আটকে ছিল। এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিরা ‘শট-হোর্ডিং’ বলে অভিহিত করেছেন; এক্ষেত্রে একটি কম উদার শব্দ হলো ‘ভ্যাকসিন বর্ণবাদ’।
মহামারির শুরুর দিকে প্রায়শই বলা হতো যে বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলো সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। সম্ভবত কিছু পরিমাণে স্থিতিস্থাপক জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যকর সামাজিক কাঠামোর কারণে। তবে এর বড় কারণ তাদের জনসংখ্যার অধিকাংশই তরুণ এবং এই কারণে ঝুঁকিও ছিল কম। কিন্তু ভ্যাকসিন বর্ণবৈষম্য সেই প্রবণতাগুলোকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উলটে দিয়েছে। ইউএনডিপির একজন অর্থনীতিবিদ ফিলিপ শেলেকেন্সের বিশ্লেষণ অনুসারে, যদিও ধনী দেশগুলো মহামারির প্রথম বছরে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় ছিল, ২০২৩ সাল নাগাদ উচ্চ আয়ের, উচ্চ-মধ্যম আয়ের এবং নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ক্রমবর্ধমান অতিরিক্ত মৃত্যুহারে পার্থক্য কমে এসেছে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অতিরিক্ত মৃত্যুহার ছিল এবং ইতিমধ্যে ২০২০ সালের মতো এ বছরও তা অনেক বেশি হয়েছে।
ধনী বিশ্বের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গণটিকা দেওয়ার যুগে মৃত্যুর হার কম থাকায়, লোকেরা বেশির ভাগই ইতিমধ্যে মহামারির জরুরি অবস্থা থেকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্রদের জন্য করোনার ‘শেষ’ দেখা অনেক কঠিন। বিশেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনো পোলিওকে জরুরি অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করছে। গত বছর বিশ্বব্যাপী এমন ৮০০ কেস ধরা পড়েছে।
সামগ্রিকভাবে বিশ্বব্যাপী করোনার গল্পটি কিছুটা আলাদা। দ্য ইকোনমিস্টের ধারণা, ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫০ লাখেরও কম। ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ কোটির নিচে। ২০২২ সালে ছিল ৬০ লাখের কিছু বেশি এবং এ বছর এখন পর্যন্ত ১০ লাখের একটু বেশি। এতে স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে, কোভিড-১৯ আক্রান্তের রেখা এখন নিম্নগামী। তবে এটি এখনো শূন্য থেকে বেশ দূরে। আপাতত কোভিডের অন্তিম পর্যায়টি কিছুটা নৃশংস অবস্থায় রয়েছে, যদিও আগের মতো দুর্ভোগ আর নেই। আর এই স্বস্তির কারণেই আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বব্যাপী প্রত্যাহার করা হলো কোভিড-১৯-এর জরুরি অবস্থা।
লেখক :কলামিস্ট ও ‘দি আনইনহ্যাবিটেবল আর্থ’ শীর্ষক গ্রন্থ রচয়িতা
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে অনুবাদ : ফাইজুল ইসলাম