ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ১২০ বছরের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মূল ভবন ভেঙে ৫ হাজার বেডের অত্যাধুনিক ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে ঐতিহাসিক সেই আমতলার গেটটি রাখা হবে। এই হাসপাতালটি রাজধানীসহ সারাদেশের ধনী-গরীব, নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত আয়ের মানুষদের জন্য নির্ভরতা ও আস্থার প্রতীক। কিন্তু দেশের সর্ববৃহৎ সরকারি চিকিৎসা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানটিতে সম্প্রতি রোগীর সেবার চেয়েও বড় ইস্যু হয়ে দেখা দিয়েছে এর ১২০ বছরের পুরনো জরাজীর্ণ ভবন। এখানে ভর্তি হওয়া রোগীরা যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে যখনই এর ছাদের দিকে তাকান, তখনই আঁতকে ওঠেন। এখানে চিকিৎসা করে সুস্থ হবেন নাকি তার আগেই ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে আরও ভয়াবহ কিছু ঘটবে এই চিন্তায় এখন আচ্ছন্ন এখানে ভর্তি হওয়া রোগী ও তার স্বজনরা।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মূল ভবনটি ১৯০৪ সালে আসামের গর্ভনরের সচিবালয় ছিল। ব্রিটিশরা ১৯৪৬ সালের ১০ জুলাই ২০০ বেডের হাসপাতাল করেছিলেন। যুদ্ধাহত সৈনিকদের ফিল্ড হাসপাতাল হিসেবে এখানে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হতো। ১৯৭২ সালে ১০৮০ বেডের হাসপাতাল করা হয়। বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপতাল ২৬০০ বেডের। এরমধ্যে মূল ভবনে শয্যা সংখ্যা ১৭০০। ১০ তলা বিশিষ্ট ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-২ ভবনে ৬০০ বেড এবং পৃথক বার্ণ ইউনিট আছে ৩০০ বেডের। প্রতিদিন এই হাসপাতালে রোগী ভর্তি থাকে সাড়ে ৩ হাজার থেকে চার হাজার। বহিঃবিভাগে দৈনিক দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৪ থেকে ৫ হাজার রোগী চিকিৎসার জন্য আসেন। এখানে কোন রোগী হয়রানি হন না। সবার ভর্তির সুযোগ মেলে। সারাদেশে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের ৮০ ভাগই আসেন এই হাসপাতালে।
১৯৫৫ সালে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কলেজ ভবন নির্মাণ করা হয়। ১৯৭৫ সালে প্রশাসনিক সুবিধার্থে কলেজ ও হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ পৃথক করা হয়। কলেজের দায়িত্ব ন্যস্ত হয় অধ্যক্ষের ওপর, হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ হয় পরিচালকের ওপর। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করা প্রতিষ্ঠানটি ধনী-গরীব সবারই আস্থা অর্জন করেছে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তৎকালীন ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকার আমতলা থেকে মিছিল বের করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের প্রবেশদ্বারের বাঁ পাশে এই আমতলা গেট। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির বহু স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম এই আমতলা। আমতলা গেটটি সংস্কার করে রাখা হবে ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে। ১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে আমতলায় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ডা. ফজলে রাব্বি, ডা. আলিম চৌধুরীসহ ৮১ জন চিকিৎসক শহীদ হয়েছিলেন। একই সঙ্গে ১৭ জন ছাত্রও শহীদ হন। তাদের নাম ও ছবি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ ভবনে টাঙানো আছে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পুরনো মূল ভবনটি ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে একথা পুরনো। তবে ভূমিকম্পের ঝুঁকির সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে হাসপাতালের দেয়াল এবং সিলিং থেকে খুলে পড়া পলেস্তারার টুকরো। পুরাতন ভবনটির বেশির ভাগ দেয়ালই ইট শুরকি দিয়ে তৈরি। আর ছাদে ব্যবহার করা হয়েছে তদানীন্তন নির্মাণশৈলী অনুযায়ী রেললাইনের স্লিপার। সে সময়ের দৃষ্টিনন্দন ভবনটি সময়ের সঙ্গে বুড়িয়ে গেছে, পাশাপাশি হাসপাতালে দিনকে দিন রোগী বাড়ায় সেই রেল স্লিপারের ওপরেই নির্মিত হয়েছে সম্প্রসারিত ভবন। রোগীদের নিরাপদ আশ্রয় হওয়া ১২০ বছরের পুরনো এই ভবনটি এখন নিজেই আর নিরাপদ নেই। বর্তমানে মূল ভবনে হাসপাতালের পরিচালকের অফিস। এই অফিসের নিচেই ছিল ব্রিটিশদের অস্ত্র কারখানা। সম্প্রতি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মূল ভবন পরিদর্শনে অগ্নিকান্ডের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ডাক্তার, নার্স, কর্মচারীরা বলেন, এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি যেকোন সময় জগন্নাথ হলের মতো ভেঙে পড়ে বিভীষিকাময় অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজমুল হক বলেন, ৫ হাজার বেডের নতুন ভবনটি নির্মাণ করতে ৫ থেকে ৭ বছর সময় লাগবে। এই সময়ে রোগীদের চিকিৎসা সেবা যাতে ব্যাহত না হয় সেজন্য পুরাতন ভবনের যে অংশ মেরামত করার অযোগ্য সেটা ভেঙে ফেলা হবে। আর যেটা মেরামত করার যোগ্য সেটা সংস্কার করা হবে।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ৫০০০ বেডের অত্যাধুনিক হাসপাতাল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সব ধরনের চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা রয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, নিউরো সার্জারি, অর্থপেডিক, হৃদরোগ, বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টসহ সাব-স্পেশালাইজড সব ধরনের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে এখানে। সঠিকভাবে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত ও নতুন ভবন নির্মাণ করতে পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের যুগ্ম সচিবকে (উন্নয়ন) আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। হাসপাতালের মূল ভবন, ডিএসসি-২ ভবনের সামনে ডক্টরস হোস্টেলের রক্ষণাবেক্ষণ করাসহ তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেছেন।
স্থাপত্যবিদ ইকবাল হাবিব ইত্তেফাককে বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শত বছরের পুরনো যে ভবন রয়েছে তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। এখন আপনি চাইলেই এটা ভেঙে ফেলার সুযোগ নাই। ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করতে হবে। এই ভবনটি ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত। এই ভবনটির নকশা ঠিক রেখে সংরক্ষণ করতে হবে। আমার বিশ্বাস এই কাজ করার মত মানুষ আমাদের আছেন। তারা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন। ভবনটিকে কিভাবে সংরক্ষণ করা যায় সেটা ভেবে দেখবেন।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. শফিকুল আলম চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, হাসপাতাল ভবন ও কলেজ বিল্ডিং ভাঙা হবে এটা ঠিক। তবে, তার আগে, বকশি বাজারে ডা, ফজলে রাব্বী হলের মাঠে দুইটি অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এরপর পুরানো ভবন ভাঙার কার্যক্রম শুরু হবে।