রুশ দেশে রবির আলো

রবীন্দ্রনাথ যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন তখন সে দেশের সুধীমহলে তো বটেই, সাধারণ পাঠক মহলেও তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। ১৯৩০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বার্লিন থেকে বিশেষ ট্রেনে অতিথিরা মস্কোয় পৌঁছালেন। কবির অন্যতম সফরসঙ্গী ছিলেন বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের কন্যা মারগারিতা আইনস্টাইন। রবীন্দ্রনাথের রাশিয়া সফর বলাই বাহুল্য তার সঙ্গে রাশিয়ার জনমানসের আরো নিবিড় সংযোগ গড়ে তোলে। রবীন্দ্রনাথের সত্তর বছরের জন্মতিথিতে সে দেশের বুদ্ধিজীবী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের সাগ্রহ অংশগ্রহণের মধ্যে প্রকাশিত হয় The Golden Book of Tagore। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪৪ সালে মস্কো থেকে প্রকাশিত সাহিত্যবিষয়ক পত্রিকা Modern Review-তে সোভিয়েত কবি নিকলাই তিখনভ লিখলেন ‘রাশিয়ার কাছে যেমন লেভ তলস্তয়, ভারতের কাছে রবীন্দ্রনাথও তা-ই।’

রাশিয়ার জনগণের কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহান সাহিত্যিক, অক্লান্ত সংগ্রামী, জাতিগত মৈত্রী ও শান্তির সোত্সাহী প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত। রবীন্দ্রনাথের বই রাশিয়াতে ছাপা হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ কপির ওপরে এবং অনুবাদ হয়েছে রুশ ছাড়াও রাশিয়ার প্রতিবেশী ইউক্রেন, উজবেকিস্তান, আর্মেনিয়াসহ ১৮টি জাতীয় ভাষায়। তার নাটক রাশিয়ার রঙ্গমঞ্চে সাফল্যের সঙ্গে অভিনীত হয়।

প্রাক-বিপ্লব রাশিয়ায়, রুশ ভাষায় রবীন্দ্রনাথের রচনার প্রথম অনুবাদের কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন বিখ্যাত রুশ সাংবাদিক ও সমালোচক ভিক্তর শক্লোভস্কি। ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির বহু আগেই শক্লোভস্কি ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’র অন্তর্গত প্রায় সব কবিতা রুশ ভাষায় অনুবাদ করে ফেলেন—যা পর্যায়ক্রমে ১৯১৩ সালের ৬ জুন পর্যন্ত রুশ সাহিত্য পত্রিকা ‘রুশ সমাচার’-এ প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ঘটনা রুশ দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। মস্কোর বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা ‘নিভা’তে ডিসেম্বর ১৯১৩ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে করা হয়েছিল প্রচ্ছদ নিবন্ধ। এই সংখ্যায় ভিক্তর শক্লোভস্কি লেখেন ‘রবীন্দ্রনাথের রচনা থেকে নিঃসন্দেহে এটাই প্রমাণিত হচ্ছে, সে দেশে রেনেসাঁসের এক নব অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।’

১৯১৩ থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে রুশ দেশে প্রকাশিত ‘গীতাঞ্জলি’র ছয়টি অনুবাদের মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত লেখক ইভান বুনিন, যিনি পরে নোবেল পুরস্কার পান, তার অনূদিত ও সম্পাদিত সংকলনটি। ১৯১৪ ও ১৯১৫ সালে রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক বক্তৃতাবলি সাধনা এবং গীতিনাটক চিত্রাঙ্গদা, রাজা ও ডাকঘরের অনুবাদ প্রকাশিত হয়। সর্বাপেক্ষা বৃহদায়তনের যে রবীন্দ্র রচনা সংকলন প্রকাশিত হয় ১৯১৫ সালে সেটি ছিল ‘Glimpses of Bengal Life’ নামে ইংরেজি ভাষায় রজনীরঞ্জন সেন অনূদিত রবীন্দ্রনাথের ১৩টি ছোটগল্পের রুশ অনুবাদ। রবীন্দ্রনাথের এই ছোটগল্পগুলো সেদিন রুশ পাঠকমহলে চাঞ্চল্য সঞ্চার করেছিল। এই সংকলনটির সম্পাদনা করেছিলেন প্রতীকবাদী কবি জিনাইদা ভেনগেরভা।

সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর সোভিয়েত শাসনক্ষমতার প্রথম আমলে রবীন্দ্র রচনার গবেষণা ও প্রচারের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ক্রেমলিনে লেনিনের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’, ‘ঘরে বাইরে’-এর রুশ অনুবাদ, জার্মান অনুবাদ পাওয়া গেছে। জার্মান সংস্করণের প্রায় প্রতিটি পাতার মার্জিনে লেনিনের নিজের হাতে লেখা মন্তব্য আছে। লেনিনের সহধর্মিণী ক্রুপস্কায়া একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাবিষয়ক লেখা সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করতেন। তার ‘বিশ্বশিক্ষাব্যবস্থা’ গ্রন্থ রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাসংক্রান্ত ভাবনাচিন্তার সপ্রশংস উল্লেখ আছে।

সরাসরি বাংলা থেকে রবীন্দ্র রচনা প্রথম রুশ ভাষায় অনুবাদের কৃতিত্ব, রাশিয়ায় বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে বাংলা ভাষা চর্চার পথিকৃৎ তুবিয়ানস্কি এবং সে দেশে দাউদ আলি ছদ্ম নামে পরিচিত ভারতীয় বিপ্লবী প্রমথনাথ দত্ত। বিশেষত প্রমথনাথ দত্তই প্রথম সোভিয়েত ইউনিয়নে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা ভাষা শিক্ষার গোড়াপত্তন করেন। বিশের দশকে ‘মস্কোর রাষ্ট্রীয় ললিত সাহিত্য প্রকাশনালয়’-এর মতো রাষ্ট্রীয় ও বড় প্রকাশনালয় থেকে রবীন্দ্রনাথের রচনা ১৫ থেকে ৩০ হাজার কপিতে প্রকাশ হতে থাকে।

রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে সোভিয়েত ও ভারতের বিশিষ্ট লেখক ও গবেষকদের একটি সুবৃহৎ সংকলন প্রকাশিত হয়। ১৯৬১ সালে সংকলনটি প্রকাশ করে সোভিয়েত বিজ্ঞান আকাদেমি। ভারতবর্ষের যেসব লেখক এই সংকলনটিকে অলংকৃত করেছেন তাদের নামের তালিকা থেকে গ্রন্থটির ব্যাপ্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা করা যেতে পারে—বিষ্ণু দে, শান্তিদেব ঘোষ, গোপাল হালদার, প্রশান্ত কুমার মহলানবিশ, সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, মেঘনাথ সাহা, সৈয়দ মুজতবা আলী। ভারতীয় লেখকদের লেখা সংকলনটির জন্য রুশ ভাষায় অনুবাদ করেন সোভিয়েত কবি নিকলাই তিখনভ।

রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে ১৯৬১ সালে মস্কোর রাষ্ট্রীয় ললিত সাহিত্য প্রকাশনালয় থেকে রুশ ভাষায় ১২ খণ্ডের রবীন্দ্র রচনাবলি প্রকাশিত হয় এবং ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ভাঙার আগ পর্যন্ত এর মুদ্রণসংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এই সোভিয়েত আমলেই তার রচনা সে দেশের ২৩টি জাতীয় ভাষা যেমন উজবেক, তাজিক, আর্মেনীয় ইত্যাদি ভাষায় দেড় শতাধিক বার প্রকাশিত হয়েছে, যার মুদ্রণসংখ্যা ৬০ লাখেরও বেশি। আজ এক শতাব্দীর বেশি কাল ধরে রাশিয়ায় রবীন্দ্রসাহিত্যের গবেষণা, চর্চা ও অনুবাদের কাজ চলছে।

রুশ ভাষায় রবীন্দ্রনাথের সর্বাধিক অনূদিত কাব্যগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলি’, সর্বাধিক জনপ্রিয় উপন্যাস ‘নৌকাডুবি’, ‘ঘরে বাইরে’ ও ‘গোরা’ এবং সর্বাধিক পরিচিত নাটক ‘ডাকঘর’। সাম্য ও ন্যায়ের প্রতীক মহান মানবপ্রেমিক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর সৃষ্টিগুলো রাশিয়ার জনগণের কাছে এখনো একান্ত শ্রদ্ধার।

লেখক : বাংলাদেশ প্রতিনিধি, জার্মান ইনস্টিটিউট অব অলটারনেটিভ এনার্জি