এই একবিংশ শতাব্দীতে আসিয়াও আমরা এক অদ্ভুত সময় পার করিতেছি। পাকিস্তান আমলের পরাধীনতা এবং আমাদের স্বাধীনতা মিলাইয়া ৭৫ বৎসর পার হইয়া গিয়াছে; কিন্তু কিছু মৌলিক জিজ্ঞাসার মীমাংসা এখনো হয় নাই। ব্রিটিশরা তাহাদের বিশ্বস্ত আমলাদের দিয়াই পৃথিবীর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জায়গা শাসন করিতে পারিয়াছিল। কারণ, তাহারা ছিল অত্যন্ত দক্ষ এবং নিরপেক্ষ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারে ঘুরিয়া ফিরিয়া ভিন্ন ভিন্ন দল ক্ষমতায় থাকিবে। ইহাই স্বাভাবিক। রাজনীতিবিদরা কখনো পক্ষপাতমূলক আচরণ করিতেও পারেন, তাহারা ক্ষমতায় স্থায়ীও নহেন। এই জন্য একটি আধুনিক রাষ্ট্রের প্রয়োজন হয় এমন একটি স্থায়ী দক্ষ ও প্রশাসন—যাহারা দলনিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করিবেন। অর্থাৎ আমলারা হইবেন পক্ষপাতহীন। বর্তমানে আমরা যে অর্থে আমলাতন্ত্র বুঝিয়া থাকি তাহার বিকাশ শুরু হইয়াছে উনিশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় দেশসমূহের রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে। আমলাতন্ত্রের ইংরেজি প্রতিশব্দ ব্যুরোক্রেসি। শব্দটি আসিয়াছে ফরাসি হইতে। ফরাসিতে শব্দটি আসিয়াছে ফরাসি ‘Bureau’ এবং গ্রিক ‘Kratos’ শব্দের সমন্বয়ে। ইহাদের অর্থ যথাক্রমে ডেস্ক (অফিস) এবং শাসন। আধুনিক আমলাতন্ত্রের জনক জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার। তিনি উনিশ শতকে তাহার ‘এসেজ ইন সোসিওলোজি’ গ্রন্থে আমলাতন্ত্র সম্পর্কে বলিয়াছেন, আমলাতন্ত্র হইল প্রশাসনের একটি ব্যবস্থা, যাহার বৈশিষ্ট্য দক্ষতা, অপক্ষপাতিত্ব এবং মানবিকতার ঊর্ধ্বে কাজ করা। স্পষ্টতই এইখানে দুইটি বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—দক্ষতা, অপক্ষপাতিত্ব।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে ৭৫ বৎসরে তৃতীয় বিশ্বের কিছু দেশের রাজনীতিও ঠিক হইল না, আমলারাও ঠিক অপক্ষপাতমূলক হইল না। যাহারা যখন ক্ষমতায় থাকেন, আমলারাও যেন তাহাদের হুকুমেই চলেন! এমনকি অনেক সময় থানায় জিডি পর্যন্ত গ্রহণ করা হয় না। যদি বলা হয়, ‘কেন জিডি নেওয়া হইল না? ক্ষমতাসীন দলের লোক বলিয়া তাহার বিরুদ্ধে জিডি নেওয়া হইল না?’ তখন ইনিয়ে বিনিয়ে যেইটুকু উত্তর পাওয়া যায় তাহার তরজমা দাঁড়ায়—‘ঐ আর কি! কয় তো তা-ই!’ এই রকম অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যাইবে। এখন, প্রশাসনের কর্মচারী-কর্মকর্তারা যদি পক্ষপাতমূলত আচরণ করেন, তাহা হইলে আমলাতন্ত্র সৃষ্টির মূল সূত্রটিই অমান্য করা হয়। দুঃখজনকভাবে, ব্রিটিশরা চলিয়া যাইবার পর আজ অবধি কেহ এই সমস্যার দিকে নজর দিলেন না, কেহ প্রশ্ন তুলিলেন না! আমলারা সম্ভবত তাহাদের কার্যবিধির পুস্তিকাটিও মনোযোগ দিয়া পড়িয়া দেখেন না।
কিন্তু নিয়ম তো মানিতেই হইবে। ক্ষমতাসীন দলের লোক বলিয়া কেহ পার পাইয়া যাইবেন—তাহা হইতে পারে না। প্রশাসনের লোক যদি মনে করেন, ক্ষমতাসীনদের তুষ্ট করিতেই হইবে—তাহা হইলে ক্ষতি হইবে প্রশাসনের। কোথায় কেহ যদি প্রশাসনের কাহাকে তুষ্ট করেন, তাহা হইলে সেই টাকা পরোক্ষভাবে সরকারি অর্থের অংশ হইতেই খরচ হয়। একটি ইংরেজি প্রবাদ রহিয়াছে, যাহার অর্থ হইল—পৃথিবীতে কোনো ফ্রি লাঞ্চ নাই। কোথাও যদি বিনা মূল্যেও কিছু দেওয়া হয়, উহার অবশ্যই নেপথ্য কোনো উদ্দেশ্য থাকে। সুতরাং প্রশাসনের কেহ অন্য কাহারো নিকট ফ্রি সুবিধা লইলে, তাহাকেও যৌক্তিক মূল্যের সুবিধা প্রদান করিতে হয়। কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তিই কখনো নিজেকে নিয়মকানুনের বাহিরে নিজেকে বিকাইয়া দিবেন না। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র হইল হৃদপিণ্ডের মতো, উহার ভিতর কত ধরনের ফাংশন এবং অন্তঃস্থ শিরা-উপশিরার জালিকা রহিয়াছে, তাহা কল্পনার বাহিরে। সুতরাং যাহারা মনে করেন, রাষ্ট্রযন্ত্রকে চিনেন, তাহা হাতুড়ে ডাক্তারদের মতো, যাহারা বিভ্রমে মনে করেন হৃদপিণ্ডের সকল কিছু তাহারা জানেন, বোঝেন। সুতরাং রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যকার বিপুল শিরা-উপশিরার কোনো জালে আটকাইয়া যাইতে পারে নিয়মের বাহিরে চলা ব্যক্তিবর্গ। সেই ক্ষেত্রে কেঁচো খুঁড়িতে কেউটে বাহির হইলেও অবাক হইবার কিছু থাকিবে না। ইহাতে বিপদ কিন্তু উভয় পক্ষেরই। পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে দেখা গিয়াছে ক্ষমতাসীনদের প্রতি অতি আনুগত্যে প্রশাসন শুধু দুর্বল হইয়াই পড়ে না, জনস্বার্থও তাহাতে বিঘ্নিত হয়। দুর্বল হইয়া পড়ে আইনের শাসন। তখন ঈশানকোণে জমিতে শুরু করে বজ্রগর্ভ কৃষ্ণমেঘের ঘনঘটা। আর সেই দুর্যোগের ঘনঘটা ছড়াইয়া পড়িতে পারে অগ্নিকোণ, নৈর্ঋতকোণ, বায়ুকোণসহ সমস্ত চরাচরে। এই সকল কারণেই নৈরাজ্য আসে, বিপ্লব সৃষ্টি হয় একটি জনপদে। সুতরাং নিয়ম মানিয়া চলা সকলের জন্যই মঙ্গলজনক।