জার্মানির পররাষ্ট্রনীতি: ভারসাম্যে জটিলতা

জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবকের কূটনীতির কেন্দ্রে রয়েছে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার। কিন্তু প্রায়শই তা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে মিলছে না। ২০২১ সালের শেষ দিকে সরকার গঠনের পর থেকে জার্মানির সামাজিক গণতন্ত্রী দল এসপিডি, গ্রিন পার্টি ও মুক্ত গণতন্ত্রী এফডিপি দলের জোট সরকার 'মূল্যবোধ কেন্দ্রিক' পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এগিয়ে চলেছে। 

গ্রিন পার্টির নেতা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকারকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন। যখনই তিনি বিদেশ সফরে যাচ্ছেন, তিনি এই মূল্যবোধের কথা বলছেন। যেসব দেশে এসব মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে তাদের যেমন তিনি প্রশংসা করছেন, তেমনি যারা করছে না, তাদের তীব্র সমালোচনাও করছেন। 

দ্বিতীয় তালিকায় রয়েছে জার্মানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সহযোগী এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন। গত মাসে তিনি চীন সফর করেছেন। তবে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিন গাং যৌথ সংবাদ সম্মেলনেই বেয়ারবকের কথার জবাব দিয়েছেন। 

তিনি বলেছেন, 'আপাতত পশ্চিমের কোনো স্কুল শিক্ষক প্রয়োজন নেই চীনের।' বেয়ারবককে শুধু চীনেই নয়, তার বক্তব্যের জন্য সমালোচনা শুনতে হয়েছে নিজ দেশেই। বলা হচ্ছে, তিনি বরং জার্মানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সহযোগীর প্রতি শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব দেখিয়েছেন।

জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক

অনেকে আবার কোনো কোনো ইস্যুতে জার্মানি ঠিকমত শক্ত অবস্থান দেখাচ্ছে না বলেও সমালোচনা করছেন। যেমন, ইরানে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া জার্মান-ইরানি নাগরিক জামশিদ শার্মাদের ব্যাপারে জার্মানি শক্ত অবস্থান নেয়নি বলে অভিযোগ আছে জামশিদ কন্যার।

ভারসাম্য রক্ষা

মূল্যবোধ ও স্বার্থের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয় বলে মনে করেন বার্লিন ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক জার্মান ইন্সটিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ও সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের সাব সাহারা আফ্রিকান বিশ্লেষক ক্যারোলিন আইকহফ। তিনি বলেন, 'যখন বৈদেশিক সম্পর্কের সিদ্ধান্তগুলো মূল্যবোধ ও স্বার্থের মাঝে সম্পর্ক তৈরি করে, তখনই কেবল তা প্রাসঙ্গিক হয়।'

শুধু জার্মানি নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নও মূল্যবোধ ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাস করে।

শুধু জার্মানি নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নও মূল্যবোধ ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাস করে। যেমন, উন্নয়ন সহায়তা দেবার ক্ষেত্রে তারা অংশীদার দেশের দুর্নীতি, নারীর প্রতি সহিংসতা ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে নজর রাখে। 

কিন্তু স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলো তা ভিন্নভাবে দেখে। যেমন, চীন ও রাশিয়া অস্ত্র দেওয়া এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের জন্য অংশীদার দেশে গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতির ধার ধরে না।

চীন ও রাশিয়া অস্ত্র দেওয়া এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের জন্য অংশীদার দেশে গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতির ধার ধরে না।

পররাষ্ট্রনীতিতে কপটতা

জার্মান ভিত্তিক ফ্রিডরিখ নাউমান ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, আফ্রিকার দেশগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে চীনের হস্তক্ষেপ না করার নীতিতে খুশি। তারা ইউরোপের নীতিকে 'পিতৃতান্ত্রিক' মনে করে। ইউরোপের পররাষ্ট্রনীতিতে কপটতার অনেক নিদর্শনও দেখা যায়।

আইকহফ বলেন, 'আফ্রিকার দেশগুলোতে মানবাধিকার বিষয়ে ইউরোপের অঙ্গীকার প্রশ্নের মুখে পড়ে যখন অভিবাসন ইস্যুতে তাদের অবস্থান বিশ্লেষণ করা হয়।' তবে আফ্রিকায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের জবাবে পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে জি-৭ দেশগুলো গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সঙ্গে আরও সক্রিয় সম্পর্ক তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছে।

আফ্রিকার দেশগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে চীনের হস্তক্ষেপ না করার নীতিতে খুশি।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে মিত্রের খোঁজে

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনে মূল্যবোধ ভিত্তিক বন্ধুত্ব বা সহযোগিতা পরীক্ষার মুখে পড়েছে। এই যুদ্ধ শক্তিশালী দেশ কর্তৃক একটি দুর্বল দেশ ও তার সীমানার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের উদাহরণ তৈরি করেছে। 

অথচ ব্রাজিল বা ভারত, যাদের ইউরোপ বন্ধু বলে মনে করে, তারা জাতিসংঘে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি। হালে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইয়োহানেস ফারভিক বলেন, 'এই দেশগুলো শুধু নিজেদের স্বার্থই দেখছে না বরং দ্বিমুখী অবস্থান নিয়েও সমালোচনা করছে।'

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনে মূল্যবোধ ভিত্তিক বন্ধুত্ব বা সহযোগিতা পরীক্ষার মুখে পড়েছে।

তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধনে এখন গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের যে নতুন বৈশ্বিক সংঘাত তৈরি হয়েছে, সেখানে খুব কম দেশই জড়াতে চায়।' এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম সদস্য ফ্রান্সও এই মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। 

সম্প্রতি চীন সফর থেকে ফিরে দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ তার ইউরোপীয় সহযোগীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা এমন সব সংকট থেকে দূরে থাকে 'যেগুলো তাদের নয়'।