ইতিহাসের সন্ধানে শিক্ষার দর্শন

ইতিহাস, সাহিত্য এবং দর্শনের ব্যাপক অনুশীলন ছাড়া কোনো জাতিই পরিশীলতা অর্জন করতে পারে না। একটি দেশ, একটি জাতি তার সঠিক ধারা ধরে রাখতে প্রতিনিয়ত ইতিহাস এবং দর্শনের অনুশীলন জরুরি। ইতিহাস প্রতিনিয়ত মানবজাতিকে শিক্ষা দেয়; কিন্তু মানবজাতি হিসেবে আমরা খুবই কম ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। তাই অনেক ইতিহাসবিদ বলেছেন যে, এটাও ইতিহাসের শিক্ষা যে, ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা নিই না। ভঙ্গুরপ্রায় নগ্ন সমাজ যখন অশ্লীলতা আর অপবাদে পূর্ণ থাকে, ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের ইতিহাসের কাছে ফিরে যেতে হয়। ইতিহাস কী বলে? তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা আমাদের সুষ্ঠু বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ বিনির্মাণের পথ দেখায়। কিন্তু বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যখন প্রতিনিয়ত পথভ্রষ্ট হই, তখন ইতিহাস কড়া নাড়ে, স্বপ্ন দেখায়—মানুষে মানুষে সম্প্রীতির যে মানবজাতি হবে তা গড়ার। 

মানবজাতি ইতিহাসনির্ভর, কিন্তু ইতিহাস-সচেতন নয়। তাই আবেগ আর দুঃখ সমানভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়েছে, এ জাতির বুক চিরে। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিস্তর ইতিহাস রচনা নয়, পুরোনো বাঙালি জাতির নতুন ইতিহাস অনুসন্ধানে তারুণ্যরা পথ দেখাবে; কিন্তু তারুণ্যের যতটুকু উত্সাহ দরকার তার জন্য প্রয়োজন নতুনের সঙ্গে পুরোনোর সংমিশ্রণ, তবেই ইতিহাস তার পরিমার্জিত রূপ পরিশীলিতভাবে প্রকাশ করতে পারবে। শুধু ইতিহাসনির্ভর হলেই যে শতভাগ পরিশীলন অর্জন করা সম্ভব হবে এমনও নয়, ইতিহাস এবং দর্শনের ব্যাপক অনুশীলন ছাড়া বিদ্বেষ, রোষানলহীন সম্প্রীতির জাতি কখনই গড়া সম্ভব নয়। 

তাই, ইতিহাসের শিক্ষাই একটি জাতি গঠনে সবচাইতে বড় শিক্ষা হতে পারে, যদি আমরা তা অন্তরের অন্তস্তল থেকে আয়ত্ত করতে পারি। সেই সঙ্গে দর্শনের সমন্বয়ে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যেতে হবে। জাতি গঠনের পেছনে যে আরেকটি দিক রয়েছে, যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং মানবের মানবিক করিডর গড়ে তোলে, তা হলো শিক্ষা। শিক্ষার সঙ্গে যেমন স্বাস্থ্যের সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি ইতিহাসের সঙ্গে দর্শনের সম্পর্ক বিদ্যমান। শিক্ষা মানবের আত্মিক, মানবিক এবং বৌদ্ধিক চরিত্র গঠনে শুধু সহায়তাই করে না বরং মূল হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। তাই শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের শতভাগ স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। 

মূলত শিক্ষা আন্দোলন আর ভাষার প্রশ্নে ১৯৭১ সালে আমরা যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলাম, আজ স্বাধীনতার ৫১ বছর পেরিয়ে ২০২৩ সাল চলছে, এখন আমাদের বুকে হাত রেখে দেখা উচিত, তার কতটা বাস্তবে প্রয়োগ করে বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। ব্রিটিশরা ২০০ বছর শাসন আর শোষণ করে এ দেশে শতকরা ৬ শতাংশ মানুষকে শিক্ষিত করতে পেরেছিল; অর্থাৎ যে নিজ নাম দস্তখত করতে পারে। কিন্তু আমরা স্বাধীনতা পাওয়ার পরও কেন তা শতকরা ১০০ শতাংশ হলো না।

যদি তা সম্ভব হতো তাহলে হয়তো জাতিতে মানবে কিছুটা সংঘাত কমানো যেত, পুরোপুরি সমাধান  হতো এমন নয়, মানব কিছুটা হলেও শিক্ষার সংস্পর্শে এসে মানবিক হতো। জীবনের ক্ষেত্রে মূলত পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষাই যথেষ্ট নয়, পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষা যদি বাস্তবে প্রায়োগিক হতো, তাহলে হয়তো জীবন আরো সহজ হতো। যেহেতু, ইতিহাস, দর্শনের পাশাপাশি বিজ্ঞানও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিজ্ঞান বিষয়েও আমাদের উচ্চচিন্তা করার প্রয়োজন রয়েছে। বিজ্ঞান একটি জাতিকে তুলে নেয় সুউচ্চতায়। মূলত, ইতিহাসের চর্চা, দর্শনের যুক্তি আর বিজ্ঞানের বাস্তবিক গবেষণাই একটি জাতিকে এগিয়ে নিতে পারে। তাই জাতি গঠনে এই তিনটি বিষয়ে বিশেষ নজরে না রাখলে, জাতির পরিশীলতার বিকাশ ঘটানো সম্ভব নয়। ইতিহাসের দর্শন সত্য অনুসন্ধানে এবং জীবন গঠনে একটি দেশ, সমাজ ও জাতিরাষ্ট্রে সমানভাবে ভূমিকা রাখে। 

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়