ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’ মোকাবিলায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পূর্ব প্রস্তুতিমূলক সভা হয়েছে। সভায় কর্মকর্তাদের নিজ কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার পাশাপাশি আশ্রয় কেন্দ্রগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, স্বেচ্ছাসেবক ও মেডিকেল টিম গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এছাড়া শুক্রবারের (১২ মে) মধ্যে চাষিরা যেন পাকা ধান ঘরে তোলে এবং লবণ যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করেন সে বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বিসিক, কক্সবাজারকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
জানা যায়, দক্ষিণপূর্ব বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি গভীর নিম্নচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে। যা পরবর্তীতে রূপ নিতে পারে সুপার সাইক্লোনে, এমন সতর্ক বার্তা দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। রোববার (১৪ মে) নাগাদ দেশের কক্সবাজার উপকূল অতিক্রম করতে পারে ঘূর্ণিঝড় মোখা। টেকনাফ উপকূল হয়ে এটি মিয়ানমারে আঘাত হানতে পারে। এ সময় টেকনাফ উপকূল ও প্রবাল সমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিনসহ আশপাশের উপকূলীয় এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দক্ষিণপূর্ব বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় মোখা আরও উত্তর-উত্তর পশ্চিমদিকে অগ্রসর হয়ে একই এলাকায় অবস্থান করছে। এটি বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা নাগাদ চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১২৫৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে এবং কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ১১৮০ কিমি দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থান করছিল। ঘূর্ণিঝড়টি আরও ঘনীভূত হয়ে শুক্রবার (১২ মে) সকালে উত্তর-উত্তর পশ্চিম দিকে এবং পরে দিক পরিবর্তন করে ক্রমান্বয়ে উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হতে পারে।
এছাড়া ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার যা, দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় এলাকার নিকটবর্তী সাগর উত্তাল রয়েছে। কক্সবাজার-চট্টগ্রামসহ দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোকে ২ নম্বর দূরবর্তী সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার সমূহকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের পাশাপাশি গভীর সাগরে না যেতে বলা হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. আবু সুফিয়ান বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোখা মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। জেলার ৫৭৬টি সাইক্লোন সেন্টার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। এছাড়া নগদ ২০ লাখ টাকা, ১৫০ মেট্রিক টন চাল ও শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এগুলো ক্রমানুসারে প্রতিটি উপজেলায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বিশুদ্ধ খাবার পানি ও বিশুদ্ধ করণ ওষুধও সরবরাহ করা হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনে কক্সবাজারের ভবন (বিশেষ করে হোটেল-মোটেল) আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করা হবে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আঘাত হানার সম্ভাবনা রয়েছে এমন ৪টি উপকূলীয় উপজেলা কক্সবাজার সদর, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও টেকনাফে দেড় লাখ নগদ টাকা পাঠানো হয়েছে। তাছাড়া জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য ৪৯০ মেট্রিক টন চাল, নগদ ১০ লাখ টাকা, ১৯৪ বান্ডিল ঢেউটিন মজুদ রয়েছে। এছাড়া আরও ৫ লাখ টাকা এবং ৫ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চাহিদা পাঠানো হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিভীষণ কান্তি দাশ বলেন, দুর্যোগ শুরু হলে উপকূলীয় এলাকার মানুষদের নিরাপদ স্থানে নেওয়ার পূর্ব প্রস্তুতিসহ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে সিপিপি স্বেচ্ছাসেবক টীম, রেডক্রিসেন্ট, স্কাউট, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের এ বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া হলেও কক্সবাজার জুড়ে এর কোনো প্রভাব নেই। সাগরে স্বাভাবিক জোয়ার থাকলেও তেমন উত্তালতা নেই ঢেউয়ে। মুঠোফোনে কিংবা রেডিওতে খবর শুনে কক্সবাজারের মাছ ধরার ট্রলারগুলো উপকূলে ফিরতে শুরু করলেও সমুদ্রে গোসল করতে নামায় ভাটা পড়েনি। গরম উপেক্ষা করে কিছু পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। আর তারা পরিবার নিয়ে সকাল-সন্ধ্যা সমুদ্র উপভোগ করছে। তবে, সম্ভাব্য দুর্যোগ বিবেচনায় সৈকতে আসা পর্যটকদের গোসলে নিরুৎসাহিত করে টুরিস্ট পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজার টুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোল্লা মোহাম্মদ শাহীন বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সাগর উত্তাল হলে ঢেউ বড় হয়ে যায়। এ অবস্থায় সাগরে গোসল করা নিরাপদ নয়। এমন পরিস্থিতি হলে পর্যটকদের সাগরে গোসল করতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তবে, এখনো পর্যন্ত বৈরি আবহাওয়া নেই সৈকতে।
জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোখা’র প্রভাবে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছি। উপকূলে থাকা সাইক্লোন শেল্টারে ৫ লাখ মানুষের ধারণক্ষমতা রয়েছে। যেকোনো দুর্যোগে নিজ নিজ অবস্থান হতে সবাই এগিয়ে এলে তা মোকাবিলা করতে সহজ হয়।