একটি দেশের গণতন্ত্র কতখানি স্বাভাবিক তাহার অন্যতম বড় মাপকাঠি হইল—ক্ষমতার পালবদল। তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই গণতন্ত্র রহিয়াছে বটে; কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার পালাবদল যেন অনেক দেশেই ভয়ংকর এক ঘূর্ণিপাক। মোখা, সিডর, আইলার মতোই ক্ষমতার পালাবদলের সময় অনেক দেশেই বিপুল ও ব্যাপক ঘূর্ণিপাক তৈরি হয়; কিন্তু আমাদের সম্মুখে তৃতীয় বিশ্বের অন্তত এমন একটি দেশের উদাহরণ রহিয়াছে, যেইখানে ক্ষমতার পালাবদল যেন বিস্ময়কর শিক্ষা দেয় তৃতীয় বিশ্বের অন্য সকল দেশকে। দেশটির নাম ভারত। গতকাল শনিবার ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে বিধানসভার ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হয়, যেইখানে বর্তমান ক্ষমতাসীন বিজেপি রাজ্য সরকার পরাজিত হইয়াছে। নিরঙ্কুশ জয় পাইয়াছে সেই রাজ্যের বিরোধী দল কংগ্রেস। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হইল, ভোটের প্রচারণার সময় প্রতিপক্ষকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ, মারামারি-সহিংসতা সেইখানেও ব্যাপকভাবেই ঘটে। তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই এই ব্যাপারে তাহারা খুব বেশি উচ্চ শ্রেণিতে এখনো আসীন হইতে পারে নাই; কিন্তু যখনই ভোট শেষ হয়, ঘোষিত হয় ফলাফল, তখন পরাজিত দল, তাহারা ক্ষমতায় থাকিলেও, সদ্যবিজয়ী দলকে ‘শুভেচ্ছা’-‘অভিনন্দন’ জানাইতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করে না। পরাজয়ও মানিয়া লয় অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে। ইহা লোকসভা কিংবা বিধানসভা—যে কোনো নির্বাচনের ক্ষেত্রেই ঘটিয়া থাকে। গণতন্ত্রের জন্য ইহা এক অপূর্ব সুন্দর উদাহরণ।
ভারত হয়তো উন্নয়নশীল কোনো কোনো দেশের তুলনায় কোনো কোনো সূচকে পিছাইয়া রহিয়াছে; কিন্তু স্বাধীনতার ৭৫ বৎসর পরও তাহারা অদ্যাবধি ক্ষমতার পালাবদলের যেই স্বচ্ছ, সুন্দর, নান্দনিক ধারা অব্যাহত রাখিয়াছে, তাহার তুলনা চলে না। ইহাই ভারতকে মহান করিয়া তুলিয়াছে। আমরা এই ক্ষেত্রে বলিতে পারি, গণতন্ত্রের উপযোগিতা লইয়া প্রশ্ন তুলিবার যেই কয়েকটি ক্ষেত্র রহিয়াছে, তাহার মধ্যে ‘অশিক্ষার হার’ অন্যতম। যেই সকল দেশে অশিক্ষার হার মাত্রাতিরিক্ত, সেইখানে গণতন্ত্রের সূর্য নিষ্প্রভ থাকে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় ভারতের ৮৪ শতাংশ মানুষই ছিল নিরক্ষর । ধর্ম, ভাষা, নৃতত্ত্ব এবং বর্ণের দিক দিয়া বহুভাগে বিভক্ত ছিল দেশটি। তখন ভারতের গণতন্ত্র ও অখণ্ডতা লইয়াও সন্দেহ ছিল অনেকের মনে। কিমাশ্চর্যম! স্বাধীনতার পর প্রায় নিরবচ্ছিন্ন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিয়া ভারত সকল আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণিত করিয়াছে (সত্তরের দশকে ইন্দিরা গান্ধীর দুই বৎসরের জরুরি অবস্থার বিষয়টি মাথায় রাখিয়াই ইহা বলা যায়)। বিভক্ত সকলকে এক সূত্রে গাঁথিয়াছে এই গণতন্ত্রই। সর্বোপরি পরবর্তী শতাব্দীর জন্য বপন করিয়াছে উন্নয়ন ও উন্নতির বীজ। স্বাধীনতার ৭৫ বৎসর পর ভারত নিরন্তর এই প্রমাণের পক্ষেই যাবতীয় রসদ সংস্থান করিয়াছে যে, গণতন্ত্র কী না পারে! এমনকি ৮৪ শতাংশ নিরক্ষর দেশেও। বর্ণবৈষম্যে জর্জরিত ভারত যখন স্বাধীন হইয়াছিল, তখন ‘নিচু’ জাতের কেহ দেশটির প্রধানমন্ত্রী হইতে পারেন তাহা বিত্তবান বা উচ্চবর্ণের মানুষ কল্পনাতেও স্থান দিত না। পূর্বে যেই সকল সম্ভাবনা উত্থানের পূর্বেই বাতিল হইয়া যাইত, এখন তাহা সহজেই গ্রহণ করা হইতেছে গণতন্ত্রের বলেই। জাতপাতের ঊর্ধ্বে দলিত-জনজাতি পরিবারের শিশুদের স্কুলে যাওয়াটাই এখন স্বাভাবিক। তাহাও ঐ গণতন্ত্রের কারণেই। প্রায় ৯১ কোটি ভোটারের দেশ ভারত, যেইখানে রহিয়াছে ৯ লক্ষাধিক ভোটকেন্দ্র! দেশটির বিচিত্র ভৌগোলিক পরিবেশে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করাও কঠিন চ্যালেঞ্জসমূহের একটি বলা যায়। কোথাও গভীর অরণ্যে একজন মাত্র ভোটারের জন্যও ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা করিতে হয় বইকি (যেমন—গুজরাটের ‘গির’)। আবার অরুণাচল প্রদেশের সুউচ্চ পাহাড়ি জনপদে নির্বাচনি কর্মকর্তাদের হয়তো চারদিন ধরিয়া বরফাবৃত পথ পাড়ি দিয়া পৌঁছাতে হয় হাতে গোনা কয়েকজনের ভোট নেওয়ার জন্য।
এইভাবে মরুভূমি, জলাভূমি, শ্বাপদসংকুল অরণ্য—সকল জায়গায় ‘গণতন্ত্র’ তাহার ন্যূনতম ছায়া রাখিয়া যায়। ভারত ক্রমশ একতাবদ্ধ ও বৃহত্শক্তি হইতেছে এই গণতান্ত্রিক শক্তির বলে বলীয়ান হইয়াই। একটি দেশকে গণতন্ত্র কোন উচ্চতায় লইয়া যাইতে পারে—উন্নয়নশীল কোনো দেশের জন্য ভারতের মতো সর্বাধিক সুন্দর উদাহরণ আর কী আছে?