সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিদ্যমান রাজস্ব ও করনীতির ব্যর্থতার কারণে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা এবং অর্জনের মধ্যে ব্যবধান প্রতি অর্থবছর বাড়ছে। শুধু শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মৌলিক সংস্কারই বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাতকে উন্নত করতে পারে। আসছে অর্থবছরের বাজেট নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর এ কথা বলেন।
এই অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, ব্যাংক, এনবিআর এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং নিয়ন্ত্রকদের ব্যাপক সংস্কার ছাড়া এই খাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা একেবারেই অসম্ভব। গতকাল রবিবার পিআরআই কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তারের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই ব্রিফিংয়ে কি-নোট উপস্থাপন করেন পিআরআই গবেষণা পরিচালক ড. এম এ রাজ্জাক। পিআরআইয়ের হিসেবে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে ৫৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সরকার আগামী অর্থবছর ১৬ শতাংশ হারে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। কিন্তু আইএমএফের শর্ত মানতে হলে অন্তত ৩৬ শতাংশ রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রাজস্ব আয় বাড়ানোর অনেক সুযোগ রয়েছে। সাড়ে ৭ শতাংশের নিচে প্রবৃদ্ধি হবে, এই প্রাক্কলন বাস্তবতা নির্ভর নয়। বাস্তবতা হলো, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ৫ বা ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধিই অনেক বেশি।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘পাচার হওয়া অর্থ ফেরতে বিশেষ সুযোগ ঘোষণা করা হয়েছিল। কোনো টাকাই ফেরত আসেনি। স্বার্থান্বেষী মহল কেউ কেউ এ সুবিধা নেবে। কিন্তু নৈতিকভাবে এটা সঠিক নয়। বদনামের ভাগিদার হবে, কিন্তু উপকার আসবে না। সরকারের এটা একটি আন-ওয়াইজ ও ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এবার আবার প্রত্যাহার হবে। আমরা সাধুবাদ দেব, এটা আর দরকার নেই।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গত ১৫ মাস ধরে একটি সমস্যা আছে এবং তা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এটা যত দীর্ঘায়িত হয়, সমস্যা বড় হবে। ক্ষত ততটা বাড়তে থাকবে। সাধারণ মানুষের ওপর দীর্ঘস্থায়ী বোঝা চাপতে থাকবে এবং তা বড় হতে থাকবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সরকার একটা শক্তিশালী অর্থনৈতিক টিম গঠন করা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে নীতিগুলো সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
সুপারিশ তুলে ধরে আহসান এইচ মনসুর বলেন, সরকার যেটা এখন পর্যন্ত করেছে, তা খুবই ক্ষুদ্র, বড় কিছু করেনি। বড়র মধ্যে করেছিল এক্সচেঞ্জ রেট নিয়ে একটি সিদ্ধান্ত। সরকার এখনো সুদহার পরিবর্তন করেনি। মূল্যস্ফীতিকে অ্যাড্রেস করার জন্য এখন পর্যন্ত একটি পলিসি করেনি, মূল্যস্ফীতি বেড়েই চলেছে। রিজার্ভ নিয়ে এখন পর্যন্ত যে পলিসি নিয়েছে, তাতে রিজার্ভ হ্রাস বন্ধ হয়নি, এটা চলছেই। গত ৯ মাসে ১২ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে। আগামী ৮-৯ মাস যদি আরো ৮-৯ বিলিয়ন হারায়, তাহলে আমরা কোথায় থাকব?
তিনি বলেন, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় সরকারের নীতি কাজ করছে না। যদি কাজ না করে, তাহলে নীতির পরিবর্তন করতে হবে। সরকারের নীতি হওয়া উচিত, আমরা আরো রিজার্ভ বিক্রি করব না, প্রত্যেকে মার্কেটে যাও। তাহলে মার্কেটে মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর চাপ তৈরি হবে। আস্তে আস্তে স্থিতিশীলতা আসবে। আর সরকার যে ধার করে নিয়ে আসবে, সেটা জমা হবে। রিজার্ভ বাড়বে। আমাদের যেটা হচ্ছে, আস্থার ঘাটতি। তিনি বলেন, রিজার্ভ সাশ্রয়ে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছে। আর এর ফলে কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি কমেছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, ঝুঁকিতে পড়বে প্রবৃদ্ধি।
বাংলাদেশে কর্মরত বহুজাতিক কোম্পানি অডিট করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের অডিট প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অ্যাকাউন্টিং ও অডিটের ধরন আন্তর্জাতিক মানের হয়। মানহীন অডিট ফার্ম দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান অডিট করানো হলে এবং সেখানে নেতিবাচক কিছু বের হলে তাতে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হবে।
ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, দেশের ব্যাস্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলোতে চাপের আভাস থাকলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের ৫০ বছরের পরিক্রমায় আজকে যে অবস্থানে, তা একটি ইতিবাচক চিত্র। বাংলাদেশ এখন আর তলাহীন ঝুড়ির প্রসঙ্গে নেই। এটি অগ্রগতি ও উত্সাহব্যঞ্জক কতকগুলো সাফল্যের গল্প বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে ৩৩ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য ঘাটতি হলো। আমদানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হলো। যদিও পদ্ধতিটা ঠিক ছিল না, তারপরও এ উদ্যোগ ফল দিয়েছে।
আইএমএফ ঋণ গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে শুরু সময় থেকে বলা হচ্ছে, শর্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ ঋণ পাচ্ছে। কিন্তু এখানে শর্তের কোনো বিষয় নেই বলে জানান জায়েদি সাত্তার। তিনি বলেন, শর্তের বিষয়টি গণমাধ্যমের সৃষ্টি। প্রকৃত বিষয় হলো সরকারের সঙ্গে বোঝাপড়া, সরকার কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আর প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে ঋণ দেওয়া হবে না, এটাও ঠিক না।
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাস্টিক অর্থনীতির লক্ষপূরণ হবে না বলে মনে করেন ড. এম এ রাজ্জাক। তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়, প্রবাসী আয়, রপ্তানি আয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপে আছে। এই ঘাটতির ওপর আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট প্রাক্কলন করা হবে। রাজস্ব আড় বাড়ানোর জন্য পিআরআই কিছু সেক্টরের সংস্কারেরও সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রাজস্ব সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া, করের আওতা প্রসারিত করা, কর ছাড় কমানো, করপোরেট ট্যাক্স ও ভ্যাট আদায়ে সংস্কার, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং ব্যয়ের গুণমান উন্নত করা উল্লেখযোগ্য।