হাঁসফাঁসে তালের শাঁস

 

নওগাঁ

আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ

 

ছয় ঋতুর মধ্যে অন্যতম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঋতু হচ্ছে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল। চলছে মধুমাস। এই মাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে হরেকরকমের সুস্বাদু ফল। ফলের তালিকায় রয়েছে আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল, আম, জাম, লিচুসহ অন্যতম ফল তালের শাঁস। তাল ফলের নরম অংশটি খুবই সুস্বাদু। গ্রাম্য ভাষায় এটি ‘তালকুর’ নামে বেশি পরিচিত। প্রচণ্ড গরমে তালের এই শাঁসটি শহর ও গ্রামের মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়।

বর্তমানে শহর থেকে শুরু করে গ্রামের বিভিন্ন অলিগলিতে এই মৌসুমি ফল বিক্রির ধুম পড়ে। অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ীরা তাল গাছ থেকে বাধায় বাধায় অপরিপক্ক তাল ফল পাইকারি কিনে সেগুলো কেটে বিভিন্ন দামে বিক্রয় করে। তবে নরম অবস্থায় তাল শাঁসের দাম অনেক বেশি। কিন্তু দিন যতই যেতে থাকে এই তাল শাঁস ততই শক্ত হতে থাকে। তখন শাঁসের দাম কমতে থাকে এবং

 

এক সময় তাল পরিপক্ক হয়ে গেলে তখন আর এই শাঁস খাওয়া সম্ভব হয় না।  

‘ওই দেখা যায় তাল গাছ, ওই আমাদের গাঁ, ওইখানেতে বাস করে কানা বগির ছা’—গাঁয়ে এখন বকের ছানা থাক বা না থাক, উপজেলার প্রতিটি এলাকার তালগাছগুলোতে কিন্তু কচি তালে ভরে গেছে। মধুমাসের এ ফলকে কেউ বলে তালের শাঁস, কেউ বলে তালকুর, কেউ বলে তালের আঁটি।

গরমের মধ্যে তৈলাক্ত খাবারের চেয়ে তালের শাঁস অনেক উপকারি। এর রয়েছে অনেক গুণাগুণ। তাই জৈষ্ঠ্যের এ মধুমাসে বাজারে নানা ফল উঠলেও নওগাঁয় জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে তালের শাঁস। গ্রীস্মের এই দিনে আত্রাইয়ে তালের শাঁস খুবই জনপ্রিয় একটি খাবার। তাই সবার হাতে পৌঁছে যায় কচি তালের শাঁস। বর্তমানে এর চাহিদা অনেক বেড়েছে। বিক্রেতা শাঁস কেটে সারতে পারছে না, ক্রেতারা দাঁড়িয়ে রয়েছে শাঁস নিতে। 

জানা গেছে, নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার গৃহস্থদের গাছের তালের শাঁস যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী জেলাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীসহ সকল বয়সী লোকের মাঝে এই তালের শাঁসের কদর দিনদিন বেড়েই চলছে। উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই তাল গাছ রয়েছে। তবে কৃষি বিভাগে এর কোনো পরিসংখ্যান নেই। তালের শাঁস অতি সুস্বাদু হওয়ায় সকল শ্রেণির মানুষের মাঝে তালের শাঁস একটি জনপ্রিয় ফল।  উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, বাসস্ট্যান্ড এবং অলিগলিতে তালের শাঁস বিক্রি করে অনেক হতদরিদ্র মানুষ জীবিকানির্বাহ করছেন।

আত্রাই উপজেলার শাহাগোলা ইউনিয়নের আদর্শ গ্রাম এলাকার বিক্রেতা আব্দুল মান্নান জানান, তিনি প্রতিবছরই এ সময়ে তালের শাঁস বিক্রি করে সংসার চালান। গ্রামাঞ্চলে ঘুরে ঘুরে তাল ক্রয় করে এনে শাঁস বিক্রি করেন। তবে গাছ ওঠে, বাধা ধরে পাড়া সবচেয়ে কষ্টকর। বৈশাখ মাস থেকে জৈষ্ঠ্যের অর্ধেক পর্যন্ত চলবে তালের শাঁস বিক্রির কাজ। প্রতিদিন প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ শাঁস বিক্রি করা যায়। একটি শাঁস আকার ভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা দরে বিক্রি করা যায়। এতে তাঁর প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লাভ হয়। তালের শাঁস বিক্রি করে ৪ জনের সংসার ভালোই চলছে বলে জানান তিনি। 

উপজেলার রাইপুর গ্রামের ক্রেতা বিপ্লব কুমার জানান, তালের শাঁস খুবই সুস্বাদু। তালের শাঁস খেতে ভালোই লাগে। ফলে এর চাহিদা দিনদিন বেড়েই চলছে। তবে তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে উঁকি মারে আকাশে।—কবির সে কবিতার মতো সারিসারি তাল গাছ রাস্তার দু-ধারে এমন দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। কালের বিবর্তনে আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকার তাল গাছ দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে। এক সময় মানুষ শখ করে বাড়ির পাশে কিংবা রাস্তার ধারে তালের বীজ বোপণ করতো, কিন্তু এখন আর তা চোখে পড়ে না।

ক্রেতা মামুন আলী বলেন, ‘আমি প্রায়ই বাড়িতে খাওয়ার জন্য জনপ্রিয় এই তালের শাঁস কিনে নিয়ে যাই। মধুমাসের অন্যান্য ফলের তুলনায় এই শাঁস পরিবারের সকল সদস্যদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এটি নরম ও সুস্বাদু। সব বয়সের মানুষই এটি সহজে খেতে পারে। তুলনামূলকভাবে এর দামও হাতের নাগালে। কিন্তু এই শাঁস বেশিদিন পাওয়া যায় না।’

তালের শাঁসের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে ডা. রুহুল আমিন রাজ বলেন, ‘তালের শাঁস শরীরের জন্য খুবই উপকারি একটি ফল। গরমের দিনে তালের শাঁসে থাকা জলীয় অংশ পানি শূন্যতা দূর করে। এছাড়া ক্যালসিয়াম, ভিটামিন সি, এ, বিসহ নানা ধরনের ভিটামিন রয়েছে। তালে থাকা এন্টি অক্সিডেন্ট শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। কচি তালের শাঁস রক্তশূন্যতা দূর করে। চোখের দৃষ্টি শক্তি ও মুখের রুচি বাড়ায়।’