এম এ আলআমিন
মিশরের ইতিহাসে প্রথম জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ১৭ জুন মারা গেছেন। তিনি একবছরের মতো ক্ষমতায় ছিলেন। ২০১৩ সালের ৩ জুলাই জেনারেল আব্দেল ফাত্তাহ আসসিসি তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে তার হাজার হাজার সমর্থকের সঙ্গে তাকে আটক করে বিচারের মুখোমুখি করেছিল। বিচারাধীন অবস্থায় আদালত কক্ষেই তিনি মারা যান।
মিশরের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে মুরসি অনেকদিন ধরেই অনুপস্থিত ছিলেন। তা সত্ত্বেও তার মৃত্যুসংবাদ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ এই ঘটনা মিশরের অনিশ্চিত রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বিষয়টি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। কারো কাছে মুরসি একজন বীর শহীদ। কারো কাছে তিনি একজন খলনায়ক। রাজনৈতিক এসব বিতর্ক বাদ দিলেও বলা যায় মিশরের ইতিহাসে এক যুগসন্ধিক্ষণে তিনি অল্প সময়ের জন্য দেশটিতে চালকের আসনে ছিলেন।সন্ধিক্ষণটি সফল সময় হিসেবে বিবেচিত হবে না। মুরসি ছিলেন দুই একনায়কের মধ্যবর্তী সময়কার একজন রাষ্ট্রনায়ক। তিনি ইসলামপন্থি গ্রুপ মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতৃত্ব দেন। এই গ্রুপের অধিকাংশ সদস্য সাবেক একনায়ক হোসনি মোবারক ক্ষমতায় থাকার শেষের দিকে গ্রুপটি পার্লামেন্টে যোগ দিয়েছিল।
প্রবল গণআন্দোলনের (আরব বসন্তের প্রথম পর্যায়ে) মোবারক ২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এরপর ২০১২ সালের মার্চ ও মে মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ব্রাদারহুড সরকার গঠন করার সুযোগ পায়। ব্রাদারহুডের ডেপুটি নেতা খায়রাত আল শাতিরই দেশটির প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হবেন বলে সবাই আশা করেছিল। কিন্তু ব্রাদারহুড দলের বাইরে মুরসিকে তাদের নেতা হিসেবে বেছে নেয়। নেতা হিসেবে তার অর্জন খুব বেশি নয়। তবে তিনি প্রবল একটি প্রতিপক্ষের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন, এতটুকু বলা যায়।
মুরসির সংক্ষিপ্ত শাসনামল বিশ্লেষণ করতে হলে মিশরের বর্তমান ইতিহাসের দিকে একটু তাকাতে হবে। ১৯৫০-এর দশকের গোড়ায় রাজতন্ত্র উচ্ছেদের পর প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন গামাল আবদুন নাসের। তার সময় মিশরে জাতীয়তাবাদী ভাবধারার প্রাবল্য ছিল সুস্পষ্ট। তিনি সুয়েজ খাল ব্রিটেনের দখলমুক্ত করে জাতীয়করণ করেন। এ কারণে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় বীরের মর্যাদা পান। ১৯৫৪ থেকে ৭০ সাল পর্যন্ত তিনি লৌহ কঠিন হাতে দেশটি শাসন করেন। এরপর ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন আনোয়ার সাদাত। তিনিও মোটামুটি বীরের মর্যাদা পান। তার সময়ে ১৯৭৩ সালে ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ হয়। ৬৭ সালের মতো শক্তিশালী ইসরাইলি সেনাবাহিনী মিশরকে সেবার পর্যুদস্ত করতে পারেনি। বরং ইসরাইলের দখলে যাওয়া সিনাই ফেরত পায় মিশর। ১৯৭৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় তিনি ইসরাইলের সঙ্গে ক্যাম্প ডেভিড শান্তিচুক্তি করেন। এই ঘটনা মিশরের রাজনীতিতে মেরুকরণ ঘটায়। শান্তিচুক্তির জন্য ৭৮ সালে সাদাত ও ইসরাইলের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী মেনাহাম বেগিন যৌথভাবে নোবেল পুরস্কারও পেয়েছিলেন। তবে এ ঘটনা মিশরের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। অনেকের ধারণা ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির কারণেই সাদাতকে ১৯৮১ সালে প্রাণ দিতে হয়।
সাদাতের পর ক্ষমতাসীন হন তার ভাইস প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক। তিনি টানা ২০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তার সময় মিশর পুরোপুরি মার্কিন প্রভাব বলয়ে চলে যায়। তিনি দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখেন ও সীমিত পরিসরে গণতন্ত্র চালু করেন। মোবারকের বীরোচিত অর্জন নেই বটে তবে ১৯৭৩ সালের ব্যাচ হওয়ায় তার একটি সম্মানজনক অবস্থান ছিল। আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার পর ২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালন করেন জেনারেল মোহাম্মদ হোসেন তানতাবি। এরপর জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন মুরসি। তিনি ৩০ জুন ২০১২ থেকে ৩ জুলাই ২০১২ পর্যন্ত ঐ পদে ছিলেন। গত প্রায় ছয় বছর যাবত্ তিনি একাকী অবস্থায় কারাবন্দি ছিলেন। মুরসি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ব্রাদারহুড সমর্থকরা ব্যাপক বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে যা সেনাবাহিনী কঠোর হাতে সেগুলো দমন করে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক বছরে মিশর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্ব হারিয়েছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটনের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধানের বিষয়ে কায়রো আগের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে না। সৌদি আরব সে স্থান পূরণ করতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। ইয়েমেনে সৌদি জোটের হামলা ও পরমাণু চুক্তি নিয়ে ইরান-মার্কিন দ্বন্দ্ব থেকে মিশর নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে। সিরিয়ার বিষয়ে অন্য আরব দেশগুলো যেখানে বাশার আল আসাদের সরে যাওয়ার পক্ষে সেখানে কায়রো সরাসরি বাশার ও রাশিয়াকে সমর্থন করছে। ইসরাইল ফিলিস্তিন ইস্যুতেও মিশরকে অনেকদিন ধরেই আগের মতো জোরালো ভূমিকায় আর দেখা যায় না।