যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা

যুদ্ধ হলে মাশুল দেবে সবাই!

তালেব রানা

 

গত বৃহস্পতিবার মার্কিন ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করার পর ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। এর প্রেক্ষিতে ইরানের তিনটি স্থাপনায় হামলার অনুমোদন দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরিকল্পনা অনুযায়ী মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রাখা হয়, কিন্তু শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প মত পরিবর্তন করায় কোনো হামলা হয়নি। ট্রাম্পের দাবি, ১৫০ মানুষ মারা যাবে শুনে হামলা বন্ধ করা হয়েছে। কারণ ভূপাতিত ড্রোনের সঙ্গে এতো মানুষের হতাহতের বিষয়টি যুক্তিযুক্ত নয়। তিনি বলেন, ইরানে হামলার ব্যাপারে কোনো ব্যস্ততা নেই। অবরোধ কাজ করছে। ইরান কখনোই পরমাণু শক্তি হবে না।

পরমাণু কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমাদের সঙ্গে ইরানের টানাপোড়েনের অবসান হয় ২০১৫ সালে এক বহুপাক্ষিক চুক্তির মধ্য দিয়ে। চুক্তি অনুযায়ী ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে সম্মত হয়। বদলে ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে রাজি হয় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমারা। কিন্তু গত বছর ওই চুক্তি থেকে সরে এসেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। একইসঙ্গে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে এনেছেন। কোনো দেশ যাতে ইরান থেকে তেল কিনতে না পারে, সেজন্যও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি আবারো শুরুর হুমকি দিয়েছে। একইসঙ্গে বলেছে, ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ হলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে তারা। এরপরই হরমুজ প্রণালীর কাছে এক মাসের ব্যবধানে ছয়টি তেল ট্যাংকারে হামলা হয়েছে। এ ঘটনায় ইরানকে দায়ী করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্ররা। হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র সব ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। ইতোমধ্যে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও বোমারু বিমান মোতায়েন করেছে দেশটি। কিন্তু বৃহস্পতিবার মার্কিন ড্রোন ভুপাতিত করার পর একেবারে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে চলে আসে দেশ দুটি! ইরানের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোনটি ইরানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়, ড্রোনটি আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় ছিল। ইরানের দাবি ড্রোনের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫ জন ক্রুর একটি বিমান ছিল। তারা সেটি টার্গেট করেনি। এছাড়া ড্রোনটি ভূ-পাতিত করার ১০ মিনিট আগে চূড়ান্ত সতর্ক বার্তা দেওয়া হয়।

আল-জাজিরার এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা বিশ্বব্যাপী আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি এয়ারলাইন্স তাদের ফ্লাইটের হরমুজ প্রণালীর রুট পরিবর্তন করেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব দুই দেশকে উত্তেজনা প্রশমনের আহবান জানিয়েছে। এখনকার মতো যুদ্ধ এড়াতে সমর্থ হয়েছে দুই দেশ। কিন্তু এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শনিবার এ কথাও বলেছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা এখনো আছে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে কি হতো? ইরানের জবাব কেমন হতো এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সীমিত পরিসরে হামলা চালালেও ইরান নিশ্চয় পাল্টা হামলা চালাত। হয়তো কোনো মার্কিন জাহাজ বা বিমান আক্রান্ত হতো। এছাড়া ইরান উপসাগরে জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাংকারের চলাচল বিঘ্নিত করতে মাইন, ছোট আকারের নৌকা বা সাবমেরিন দিয়ে আক্রমণ চালাত। ইরান হয়তো ভাবছে, তারা যদি কয়েকটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিতে পারে— ট্রাম্প হয়তো ভাববেন, এত চড়া মূল্যে যুদ্ধ চালানোর দরকার নেই। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা হামলা চালালে কী হতে পারত? বিবিসি বলছে, এ যুদ্ধ হবে অসম, অর্থাত্ একটি পক্ষ খুবই শক্তিশালী, অন্য পক্ষ অপেক্ষাকৃত দুর্বল। ইরানের হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি নৌ-স্থাপনা, বিমান ঘাঁটির ওপর আঘাত হানতে পারে। তারা হয়তো ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে পারে, ইরানি সামরিক বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করতে পারে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হলে তা ওই অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইরান তার প্রক্সি দেশ যেমন ইরাক, সিরিয়া বা অন্যদেরকে আহ্বান জানাতে পারে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানতে। এমনকি হিজবুল্লাহ বা সিরিয়ায় থাকা ইরানি সেনাদের সমন্বয়ে ইসরায়েলের ওপর রকেট হামলা হতে পারে। এটা সবার বোধগম্য যে, আধুনিক যুগে কোনো যুদ্ধে প্রচলিত অর্থে ‘জয়ী’ হওয়া যায় না। ইরানও নিশ্চয়ই মনে করে না যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে হারাতে পারবে। প্রকৃতপক্ষে দুপক্ষই চায় কৌশলগত বিজয়। এছাড়া ইরানও হয়তো চাইছে, একটা সামরিক সংকট তৈরি করে ট্রাম্প প্রশাসনকে বিপাকে ফেলতে। যাতে যুক্তরাষ্ট্রের আগামী নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের সম্ভাবনা কমে আসে। এর ফলে আগামীতে ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলে তারা হয়তো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে পারে, নতুন একটি পরমাণু চুক্তিও হতে পারে।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের আমেরিকান স্টাডিজ বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ মারান্দি আল জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের হামলার জবাব ইরান সীমিতভাবে দেবে এটা ভাবা ঠিক হবে না। এমন হতে পারে, ইরান এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেরও টার্গেট করতে পারে। এর মধ্যে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও থাকতে পারে। কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের গালফ স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক মাহজুব জুয়েরি আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প আসলে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করতে চান। এজন্য তিনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। নির্বাচনে এটাই তার প্রতিশ্রুতি ছিল। এখন ট্রাম্পের চোখ আগামী নির্বাচনের দিকে। ইরানে বড় ধরনের হামলা তার নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ কারণে তিনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবেন না।