একসময় ইচ্ছাকৃতভাবে আইনি জটিলতা সৃষ্টি করে বছরের পর বছর স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন আটকে রাখা হতো। বিশেষ করে, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ও উপজেলা পরিষদের যারা চেয়ারম্যান থাকতেন, তাদের কেউ কেউ নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে নির্বাচন বন্ধ রেখে স্বপদে বহাল থেকে সুবিধা ভোগ করতেন। নির্ধারিত পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও কেউ কেউ এক যুগেরও বেশি সময় পদে ছিলেন—এমন উদাহরণ অগণিত। সেই পুরোনো কৌশল এবার দেখা যাচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ দেশের সাতটি পৌরসভার কোথাও কোথাও। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নির্বাচনের উদ্যোগ নিলেও কোনো কোনো পৌরসভার নির্বাচন ঠেকাতে নানা অপতৎপরতা শুরু করেছে স্বার্থান্বেষী চক্র।
মেয়াদ শেষে কেউ যেন ছলে-কৌশলে এভাবে পদ আটকে রাখতে না পারেন, সেজন্যই মেয়াদ শেষে পৌরসভাগুলোতে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রেখে গত বছরের ৩১ মার্চ সংসদে পাশ হয়েছে ‘স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) বিল-২০২২’। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর গত বছরের ১১ এপ্রিল আইনটির গেজেট প্রকাশিত হয়। কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে ইসি যখন দেশের সাতটি মেয়াদোত্তীর্ণ পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নিয়েছে, তখন কোথাও কোথাও নির্বাচন যাতে না হয়, সেজন্য নানামুখী অপতত্পরতা শুরু করেছেন কেউ কেউ।
গত বছর পাশ হওয়া পৌরসভা আইনের সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ‘এই আইনের অধীন নূতন কোনো পৌরসভা প্রতিষ্ঠা করা হইলে অথবা কোনো পরিষদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হইলে, নির্বাচনের মাধ্যমে নূতন পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত, উহার কার্যাবলি সম্পাদনের উদ্দেশ্যে সরকার প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সরকারি কর্মকর্তা অথবা সরকার উপযুক্ত মনে করেন এমন কোনো ব্যক্তিকে প্রশাসক হিসাবে নিয়োগ প্রদান করিতে পারিবে।’
আইন অনুযায়ী, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সম্প্রতি দেশের সাতটি পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে লিখিত (ইসি) অনুরোধ জানিয়েছে। সেই অনুযায়ী ইসি নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েছে। আইন মোতাবেক মেয়াদোত্তীর্ণ পৌরসভাগুলোতে ইতিমধ্যে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। কোথাও কোথাও ইতিমধ্যেই ভোটার তালিকা চূড়ান্তকরণ সম্পন্ন হয়েছে। বাকিগুলোতেও কয়েক দিনের মধ্যেই ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হবে। এরপরই সাত পৌরসভায় নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করবে ইসি।
তবে সংশ্লিষ্ট আইন-কানুন ও বিধিবিধান অনুযায়ী কোনো কোনো পৌরসভায় ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পরেও স্থানীয় স্বার্থান্বেষী চক্র নির্বাচনের পথে বাধা সৃষ্টির লক্ষ্যে নানা অপতত্পরতা শুরু করেছে। আইন অনুযায়ী যৌক্তিক সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা পৌরসভা পরিচালনায় সরকার ও নির্বাচন কমিশন যখন আন্তরিক, তখন সরকারের সেই সদিচ্ছা বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় এই চক্রটি।
ভোটার তালিকায় মৃত ব্যক্তির নাম কিংবা ভুলত্রুটি রয়েছে; এরকম ভিত্তিহীন, বেনামি ও তথ্য-উপাত্তহীন অভিযোগের ধুয়া তুলে নির্বাচন আটকে দিতে তৎপর খোদ ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেই ঘাপটি মেরে থাকা অনুপ্রবেশকারী কোনো কোনো চক্র। সরকার যখন সংবিধান ও আইন অনুযায়ী, দেশের জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আন্তরিক, তখন এই চক্রটি নির্বাচন বানচাল করে সরকারকে বিপাকে ফেলার ষড়যন্ত্রে মেতেছে। এই চক্রটির মূল লক্ষ্য, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
নির্বাচন বিষয়ে অভিজ্ঞদের মতে, অতীতেও দেখা গেছে, ভোটার তালিকায় ত্রুটি, নির্বাচনি এলাকার সীমানায় জটিলতা—এরকম নানা অজুহাত দেখিয়ে বছরের পর বছর নির্বাচন বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা কিংবা সিটি করপোরেশন—সব স্তরেই এমন ঘটনা কমবেশি ঘটেছে। মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরেও যারা পদ আটকে রেখে সুবিধা লুটতে চান এবং সুষ্ঠু নির্বাচনকে ভয় পান, তারাই এরকম অপকৌশলের আশ্রয় নেন। উদাহরণ দিয়ে নির্বাচন বিষয়ে এই অভিজ্ঞরা বলছেন, চুয়াডাঙ্গার সাতটি ইউনিয়নে দীর্ঘ ১১ বছর নির্বাচন হয়নি। সীমানা জটিলতার অজুহাতে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানরা আইনি জটিলতা সৃষ্টি করে নির্বাচন আটকে দিয়ে নিজেরা সুবিধা নেন। একইভাবে নীলফামারী সদরের খোকশাবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে ১১ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করেছিলেন একই ব্যক্তি। এরকম উদাহরণের অভাব নেই।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের ক্ষেত্রেই নয়, জাতীয় নির্বাচনেও বিভিন্ন আসনে ভোটার তালিকা ও সীমানা নিয়ে ত্রুটি বা জটিলতা থাকতে পারে। কিন্তু সেই অজুহাতে নির্বাচন বন্ধ রাখার মানে হচ্ছে স্বার্থান্বেষী মহলকে নির্বিঘ্নে সুবিধা ভোগের ক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়া।
সংশ্লিষ্ট পৌরসভার ভোটারদের মতে, ইসি নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়ায় এরই মধ্যে পৌরসভাগুলোর জনগণ ও ভোটারদের মধ্যে উত্সাহ সৃষ্টি হয়েছে। কারা জনপ্রতিনিধি হবেন সেটা নির্ধারণ করবেন সংশ্লিষ্ট পৌরসভার ভোটাররা। কেউ যদি নিজেকে জনপ্রিয় মনে করেন, তাহলে তার বা তাদের উচিত যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করা। কিন্তু সেটির পরিবর্তে যখন নির্বাচন ঠেকানোর লক্ষ্যে অপতত্পরতা চালানো হয়, তাহলে সেটির লক্ষ্য যে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, তা স্পষ্ট।
মেয়াদ শেষে পৌরসভাগুলোতে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রেখে গত বছরের ৩১ মার্চ সংসদে ‘স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) বিল-২০২২’ পাশের সময় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘প্রশাসক নিয়োগের বিধান রাখার বিষয়টি যৌক্তিক। কারণ বিভিন্ন কারণে অনেক সময় নির্বাচন করা নিয়ে আইনগত জটিলতা তৈরি হয়। অনেকে এর সুযোগ নিয়ে থাকেন।’ এর আগে গত বছরের ২৩ জানুয়ারি বিলটি সংসদে উত্থাপন করে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেছেন, ‘বিভিন্ন কারণে রিট মামলা বা অন্য কোনো মামলা করে নির্বাচন বন্ধ করে রাখা হয়। আইনি জটিলতায় বছরের পর বছর অনেক স্থানে নির্বাচন হচ্ছে না।’
বিলটি পাশের দিন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সংসদে বলেছিলেন, ‘আমরা হচ্ছি জনগণের সরকার। আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকুক, সেটা স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত, সেটিই আমাদের লক্ষ্য, বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য। বঙ্গবন্ধু সংবিধানে সেটিই বলে গেছেন। অনেক সময় সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা কোর্টে নির্বাচনসংক্রান্ত মামলা হয়। এসব মামলা অনেক দিন চলে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেছেন, ১৫ থেকে ১৮ বছরও নাকি চলে। আমি নিজে জানি, দোহার উপজেলায় স্থানীয় সরকারের এক জন চেয়ারম্যান ১৮ বছর ধরে পদে আছেন। তিনি মামলা করে সেখানে বসে আছেন। এজন্যই প্রশাসক নিয়োগের জন্য আইনে প্রভিশন রাখা হয়েছে।’