নিউজিল্যান্ডের পত্রিকায় বাংলাদেশ

নিউজিল্যান্ডের বিখ্যাত পত্রিকা ‘স্কোপ ওয়ার্ল্ড’-এ বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করে ২৯ মে নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। নিবন্ধে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, বাংলাদেশ পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে এবং দেশটির কাছ থেকে একটি শিক্ষা নেওয়া দরকার। ‘যখন একটি জাতি স্বাধীনতা এবং তার অধিকারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, যখন ন্যায়বিচার মানুষের হৃদয়ে স্থির হয়, তখন আপনি যাই করুন না কেন, এমনকি সামরিক অভিযান, এটি তাদের হৃদয় থেকে বের হয় না। কারণ ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার বীজ আমাদের মধ্যে রয়েছে’, তিনি বলেন। স্কোপ ওয়ার্ল্ড ডনের খবরে উল্লেখ করে বলছে যে, ইমরানের বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার প্রশংসা প্রমাণ করে—বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের  সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে।

পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গেছে। তারা অনেক আগেই আইএমএফের কাছে ‘বেইলআউট লোন’ চেয়েছিল; কিন্তু আইএমএফ কঠোর শর্ত আরোপের চেষ্টা করছে, যা পাকিস্তানের বর্তমান ক্ষমতাসীন জোটের পূরণ করার সামর্থ্য নেই। এমনকি পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত বন্ধু চীন ও সৌদি আরবও এখন পাকিস্তানের বোঝা বহন করতে অনিচ্ছুক।

দীর্ঘ বিলম্বিত কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় চীনের ঋণে পাকিস্তানের নির্মিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে চীন। এই ভয়াবহ লোডশেডিং চলছে সারা পাকিস্তানে। ঘন ঘন গ্রিড ব্যর্থতা। পাকিস্তানি রুপিতে ডলারের মূল্য নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, বর্তমানে পাকিস্তানকে এক ডলার পেতে ২৭৭ রুপি দিতে হয়।

১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়ে ঢাকায় আত্মসমর্পণ করে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় লাভ করে।

বাংলাদেশকে হারানোর পর ১৯৭১-২০২৩ সময়কালেও সামরিক স্বৈরশাসকরা কিছুদিনের জন্য পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করে রাখলেও সামরিক বাহিনীকে দীর্ঘদিন পাকিস্তানের শাসকের ভূমিকা থেকে দূরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এবং যখন সামরিক বাহিনী কিছু সময়ের জন্য বেসামরিক শাসকদের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়, তখনো তারা শাসনের আসল লাগাম তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এই ক্ষমতা দখলের খেলায় সামরিক প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।

২০২২ সালে যেখানে বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ১২৯তম অবস্থানে উঠে এসেছে, সেখানে পাকিস্তানের অবস্থান নেমে এসেছে ১৪৭তম স্থানে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সময়কালে অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ হিসেবে পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের শাসকদের শোষণ-বঞ্চনা, সীমাহীন বৈষম্য ও লুণ্ঠনের অসহায় শিকারে পরিণত হয়; যার ফলে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু জিডিপি পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে ৬০ শতাংশ কম ছিল; কিন্তু ২০১৫ সালে মাথাপিছু জিডিপির নিরিখে পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে যায় বাংলাদেশ।

পাকিস্তানের নেতৃত্ব বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে অনেক পাঠ শিখতে পারে, তবে প্রধান পদক্ষেপটি হওয়া উচিত যে, শেখ হাসিনা কীভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন তা অনুসরণ করা, যা প্রতিরক্ষা ও গণতন্ত্র উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। এসব বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার প্রসঙ্গ বারবার সামনে আসছে। পাকিস্তানের বিভিন্ন টকশোতে, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এখন বাংলাদেশের প্রশংসা করা হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে শেখার কথাও বলা হচ্ছে। পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ খানও বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন। পাকিস্তান এখন বাংলাদেশ হতে চায়। পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অনেক প্রশ্ন, অনেক জিজ্ঞাসা। আর সেই সব প্রশ্নের উত্তর পাকিস্তানের রাজনীতিবিদদের কাছে নেই।

পাকিস্তানের এই পরিস্থিতির জন্য রাজনৈতিক অস্থিরতা দায়ী। বর্তমানে পাকিস্তান একটি নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে মরিয়া। রিজার্ভ প্রায় শূন্য। বৈদেশিক মুদ্রাসংকটের কারণে আমদানি বন্ধ রয়েছে। জ্বালানিসংকটের কারণে অধিকাংশ কারখানা বন্ধের পথে।

বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, এশিয়ার অন্যতম সেরা অর্থনৈতিক দেশ। অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সামনের সারিতে, অনেক ক্ষেত্রে ভারতের থেকেও এগিয়ে। উন্নয়নের জন্য ‘বাংলাদেশ মডেল’-এর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। ২০৩০ সালে ২৫তম এবং ২০৪১ সালে ২১তম হবে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে ৭৫ শতাংশ বেশি দরিদ্র ছিল; কিন্তু এখন বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেশি এগিয়ে। পাকিস্তানের অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের সাহায্য নিতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করে পাকিস্তানি গণমাধ্যমে বেশ কিছু নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে পাকিস্তান সরকারকে শেখ হাসিনার কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরামর্শ  দেওয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ১৪ বছর ধরে টেকসই প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছেন। আওয়াজ উঠছে পাকিস্তানে, সিঙ্গাপুর বা নিউ ইয়র্ক নয়, আমাদের বাংলাদেশ বানাও।

স্বাধীনতার ৫২ বছরে বাংলাদেশ সব সূচকে পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে থেকে ৩০ লাখ শহিদ এবং ২ লাখ মা-বোনের ঋণ শোধ করতে পেরেছে। অন্যায়, অত্যাচারের পরিণতি পাকিস্তান অনুভব করছে; কিন্তু আক্ষেপ থাকলেও দেশটি শুধরায়নি।

লেখক: গবেষক