‘চা’ বলতে সাধারণত সুগন্ধযুক্ত ও স্বাদবিশিষ্ট এক ধরনের উষ্ণ পানীয়কে বোঝায়, যা চা-পাতা পানিতে ফুটিয়ে বা গরম পানিতে ভিজিয়ে তৈরি করা হয়। পানির পরেই চা বিশ্বের সর্বাধিক উপভোগ্য পানীয়। অনেক উপকারিতা আছে চায়ের। চা ক্লান্তি কাটাতে সাহায্য করে, শরীরে চাঙ্গা ভাব নিয়ে আসে। মানুষ যখন আস্তে আস্তে চায়ের উপকারিতা উপলব্ধি করতে শুরু করল, তখন থেকেই চায়ের জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে বিশ্বে চা-শিল্পের বেশ প্রসার ঘটেছে।
বাংলাদেশ চা-শিল্পে বেশ সমৃদ্ধ। বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুসারে, ২০২১ সালে বাংলাদেশে ১৬৭টি চা-বাগান থেকে রেকর্ড ৯ কোটি ৫ লাখ ৬ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। তার মধ্যে বেশির ভাগই দেশের বাজারে বিক্রি হয়। এই সময়ে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ১৩ হাজার কেজি চা। সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে—১ লাখ ৮০ হাজার কেজি চা।
পরিতাপের বিষয়, এই বিপুল পরিমাণ চা উৎপাদন ও রপ্তানি করার পরেও চা-শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। আগে একজন চা-শ্রমিক ১২০ টাকা দৈনিক মজুরি পেতেন। এখন তাদের দৈনিক মজুরি ৫০ টাকা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৭০ টাকা। যেখানে আজকের দিনে এক জন ব্যক্তির স্বাভাবিক দৈনন্দিন খরচ অনেক গুণ বেড়ে গেছে, সেখানে এই পরিমাণ মজুরিকে অল্পই বলতে হবে। এক জন ব্যক্তির পক্ষে এই মজুরি দিয়ে সংসারের প্রতিদিনকার খরচ মেটানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব আহমেদ কায়কাউস চা-শ্রমিকদের আবাসন, রেশনসহ অন্যান্য সুযোগসুবিধা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন। তিনি জানান, এর সঙ্গে আনুপাতিক হারে শ্রমিকদের বোনাস, বার্ষিক ছুটি, ভাতা, বেতনসহ উত্সব ভাতা, অসুস্থতাজনিত ভাতা ইত্যাদিও বাড়বে। এসবের পরও চা-শ্রমিকদের শ্রমের অনুপাতে মজুরির পরিমাণ খুবই সামান্য।
এক জন চা-শ্রমিককে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। দিনের বেশির ভাগ সময়ে তাকে চা-বাগান থেকে চা-পাতা তুলতে হয়। সারাদিন পরিবারের সবার থেকে দূরে থাকতে হয়। তার পরও যদি দৈনন্দিন খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়, তা দুঃখজনক বটে।
বাংলাদেশের বেশির ভাগ চা-শ্রমিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। তাদের বেশির ভাগ সিলেটে বসবাস করেন। প্রাকৃতিক পরিবেশ থাকায় বৃহত্তর সিলেটে চা চাষের সূচনা হয়েছিল। এখন দেশের ১৬৭টি চা-বাগানের মধ্যে ১৩৫টি (সিলেট ১৯টি, মৌলভীবাজার ৯১টি এবং হবিগঞ্জ ২৫টি) বৃহত্তর সিলেটে গড়ে উঠেছে। যেখানে হাজার হাজার চা-শ্রমিক কাজ করেন। মনে রাখতে হবে, এই বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করছেন দেশের জন্য। দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করছেন তারা। কাজেই আমার যদি চা-শ্রমিকদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করি, তবে চা-শিল্পের সুফল থেকে ক্রমশ পিছিয়ে পড়বে দেশের অর্থনীতি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে চা-শিল্পের উন্নয়নে ব্যাপক অবদানকে আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। চা-দিবসের প্রতিপাদ্য ‘মুজিববর্ষের অঙ্গীকার, চা-শিল্পের প্রসার’ বাস্তবায়ন করতে চাইলে চা-শ্রমিকদের যথাযথ মূল্যায়নের বিষয়ে ভাবতে হবে। এতে করে একদিকে চা-শ্রমিকদের শ্রমের মূল্যায়ন হবে এবং দেশ ও অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়