পরিবেশ নিয়ে আমরা কতটা সচেতন?

একবিংশ শতাব্দীতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা শব্দটা বেশ পরিচিত। কথায় কথায় আমরা একে অপরকে সচেতন হতে বলি। বাজারে ফর্মালিনমুক্ত খাবার খুঁজি। চলাচলের জন্য যানবাহনে চাই স্বস্তি। নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য  রাস্তায় নেমে মিছিল-মিটিং করি। সামাজিক, রাজনৈতিক পরিবর্তন সাধনের আন্দোলনে নামি। কিন্তু যে পরিবেশে আমরা বসবাস করি, তা নিয়ে কতটুকু সচেতন আমরা? মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষা করতে পরিবেশের ভারসাম্য নিয়ে কখনো কি জুতসই আন্দোলনের চিন্তা করছি? এ ধরনের আন্দোলনের কথা কেউ চিন্তাও করে না! পরিবেশ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল—‘প্লাস্টিক দূষণ এড়ানো’।

পরিবেশের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। জীবন রক্ষার মতোই পরিবেশ রক্ষাও অতি গুরুত্বপূর্ণ। এক জরিপে দেখা যায়, আমাদের দেশে প্রতি বছর যত মানুষ মারা যায়, তার ২৮ শতাংশই পরিবেশ দূষণজনিত বিভিন্ন অসুখবিসুখে। এজন্য পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা ও মানবজাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে পরিবেশ রক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা পরিবেশের একটি অঙ্গ। পরিবেশের প্রাকৃতিক উপাদানসমূহ সীমিত। মানুষ চাইলেই তা বাড়াতে পারবে না। তবে পর্যাপ্ত সচেতনতার মাধ্যমে পরিবেশ প্রাকৃতিক উপাদানও দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহারের উপযোগী করতে পারবে।

প্লাস্টিক পণ্য পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। কিন্তু প্রতিনিয়ত আমরা প্লাস্টিকের ব্যবহার করছি। এই প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। পরিবেশ রক্ষার্থে প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারে তত্পর হতে হবে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পূর্বশর্ত সুস্থ পরিবেশ। মনে রাখতে হবে, বেঁচে থাকার জন্য আমাদের যে অক্সিজেন আব্যশক, তা আমরা পাই পরিবেশ থেকে। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটিই প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে আমাদেরই বিভিন্ন অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডে।

সবাই জানি, পানির অপর নাম জীবন। প্রকৃতপক্ষে কথাটি হবে, বিশুদ্ধ পানির অপর নাম জীবন। দূষিত পানি জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ। পৃথিবীর আয়তনের এক তৃতীয়াংশ পানি থাকা সত্ত্বেও নিরাপদ পানির পরিমাণ খুবই সীমিত, যা মাত্র ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ। দিন দিন এর পরিমাণ কমছে। আমরা বিভিন্ন শিল্প-কারখানার দূষিত রাসায়নিক পদার্থ অ্যামোনিয়া, ক্লোরাইড, সায়ানাইড এবং বিভিন্ন ধাতুর জিংক, পারদ, সিসা ইত্যাদি পানির সঙ্গে মিশিয়ে পানি দূষিত করছি। শহর অঞ্চলে বিভিন্ন আবর্জনা, বজ্য পদার্থ যেমন :দৈনন্দিন রান্নার খোসা, রান্নার কাজে ব্যবহৃত পানি, খাদ্য দ্রব্যের ফেলে দেওয়া অংশ একত্রে নর্দমায় মিশে নদনদীর পানি দূষিত করছে। ব্যবহারের অনুপযোগী দূষিত পানি ব্যাকটেরিয়া, ক্ষুদ্র জীব, কেঁচো, সাপ, ব্যাঙ, বিভিন্ন উপকারী প্রাণী, মাছ, জলজপ্রাণী অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে।

আজকাল প্রায় মানুষই ফুসফুসে ক্যানসার, বমি, মাথাব্যথা, বুক ব্যথা, নাক-মুখ জ্বালা, অ্যাজমা, স্নায়ুতন্ত্রজনিত সমস্যা, মানসিক অস্থিরতা, শ্বাসজানিত রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত। একইভাবে পৃথিবীতে বিলুপ্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য।

গাছ আমাদের পরম বন্ধু। গাছ লাগানোর বিকল্প নেই আজকের দিনে। কিন্তু আমরা নির্বিচারে গাছ কাটছি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে কোনো দেশের মোট আয়তনের মোট ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা দরকার। কিন্তু আমাদের  দেশের মোট আয়তনের ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ বনভূমি আছে। দিন দিন এর পরিমাণ আরো কমছে।  আমাদের দেশে বন সংরক্ষণ আইন আছে, কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই। এই অবস্থায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে প্রশাসনের বন সংরক্ষণ আইন যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। সর্বোপরি আমাদের দেশে বহুল প্রচলিত স্লোগান, ‘গাছ লাগান পরিবেশ বাঁচান’ মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়