গণমুখী সাংবাদিকতার জনক হিসেবে কীর্তিত প্রয়াত তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া লিখেছেন, ‘‘আমি একজন বিপ্লবী ত নই-ই, ...। আমার চিন্তাশক্তি ও কর্মক্ষমতা সর্বতোভাবে ‘ইত্তেফাকের’ পিছনেই নিয়োজিত করিয়াছিলাম।...যে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনে ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে, সেই জনগণের অভাব-অভিযোগ, সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত করাই ছিল আমার ব্রত।...কোনো প্রলোভন বা স্বার্থচিন্তা দ্বারা আমি কখনো প্ররোচিত হই নাই।’
নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে মানিক মিয়া বলেছেন, ‘...আমি একজন সচেতন সুনাগরিক—এই দাবি আমার আছে। সাংবাদিকতা আমার পেশা এবং নেশা :দেশ ও দেশবাসীর সেবা আমার সাংবাদিক জীবনের প্রধান ও একমাত্র ব্রত। একজন সমাজ সচেতন সুনাগরিক সাংবাদিক হিসেবে দেশ ও দেশবাসীর প্রতি আমার নৈতিক দায়িত্ব আছে।’ আপন পেশা ও ব্রতে নৈতিক দায়িত্ব পালনে মানিক মিয়ার ঐকান্তিকতা এভাবেই প্রশ্নাতীত ছিল।
মানিক মিয়া আত্মসমীক্ষণ করতেও ভোলেননি—‘আমি সর্বদাই ভুল-ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে ছিলাম, এমন ধারণা আমি পোষণ করি না। ইত্তেফাকের মারফত গণ-মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, অভাব-অভিযোগ ও চিন্তাধারা প্রতিফলিত করিতে গিয়া কোথাও যদি আমি ভুল করিয়া থাকি, তাহা ছিল জ্ঞান-বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা প্রসূত।’
আত্মসমালোচক মানিক মিয়া ছিলেন একজন প্রকৃত ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। রাজনীতিমনস্ক মানুষের উপলব্ধ রাজনৈতিক দর্শন মানিক মিয়া সক্রিয় রাজনীতি করেননি; তিনি কোনো দলের সদস্যও ছিলেন না। তার জবানিতে আছে, ইত্তেফাক সম্পাদক হবার পর তার এমন নীতি-অবস্থান প্রকট হয়। কারণ, ইত্তেফাক গণমুখী সংবাদপত্র; জনগণ দলীয় বিভাজন মানে না, তারা সংবাদপত্রে তাদের সংবাদ দেখতে চায়। আরো একটি কারণ ছিলো—মনে হয়, তিনি শুধু সম্পাদক হিসেবে নিরপেক্ষ থাকতে চাননি, তার স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্ব ছিল, যা দলীয় আনুগত্যে ম্লান হয়ে যেত। প্রসঙ্গক্রমে স্মর্তব্য, একটি ঘটনা। সুহূদ কিয়ের হার্ডির প্ররোচনায় জর্জ অরওয়েল ইন্ডিপেডেন্ট লেবার পার্টির (প্রতিষ্ঠাতা কিয়ের হার্ডি) সদস্য হন; কিন্তু কিছুদিন পর তার সদস্যপদ প্রত্যাহার করেন। কারণ তার স্বাধীন মতামত বিঘ্নিত হচ্ছিল। এটা জানা কথা, লেখক হিসেবে তিনি যা হয়েছিলেন, তা সম্ভব হতো না দলীয় সদস্য থাকলে। বোধগম্য, কেন মানিক মিয়া দলীয় সদস্য হিসেবে সক্রিয় রাজনীতিতে জড়াননি। কিন্তু তিনি বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের বড় উপদেষ্টা ছিলেন; তার লেখায় আওয়ামী লীগের কথাই থাকত। উপরন্তু, মানিক মিয়ার ইত্তেফাক ছিল আওয়ামী লীগের সুহূদ। পাহাড়ের সৌন্দর্য দূর থেকে অবলোকন ও অনুভব করা যায়, কাছে গেলে তা সম্ভব নয়। নির্দলীয় না থাকলে, দলীয় রাজনীতির ডামাডোল ঠিকমতো কানে পড়ে না, দৃষ্টিগ্রাহ্যও হয় না। তাহলে প্রশ্ন ওঠে অরাজনীতিক (সক্রিয়তার অর্থে) মানিক মিয়া রাজনীতি বলতে কী বুঝতেন? ১৯৬৮-র ১৯ অক্টোবর, তিনি আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভায় একটি দিকনির্দেশক ভাষণ দিয়েছিলেন, যাতে আছে তার রাজনীতির সংজ্ঞা।
মানিক মিয়ার রাজনৈতিক দর্শনে ছাত্ররাজনীতির স্থান ছিল। তিনি একান্তভাবে বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার্থীর উচিত সার্বক্ষণিকভাবে লেখাপড়া করা। কিন্তু তবুও তারা রাজনীতি করে, এবং তা মানিক মিয়া সমর্থন করেন। কেন? তার কথাতে উত্তর আছে, তিনি বলছেন, ‘...মানবতার অবমাননা, সত্য ও ন্যায়ের অপমান অনুভূতিপ্রবণ ছাত্রসমাজের চিত্তে দোলা না দিয়ে পারে না।’ রাজবাড়ী কলেজে ছাত্র সংসদের অভিষেক অনুষ্ঠানে ১৯৬৮-তে দেওয়া এই ভাষণে মানিক মিয়া ছাত্ররাজনীতি সমর্থন করতে গিয়ে আরো বলেছিলেন, ‘‘ছাত্র আন্দোলনকে ‘ছেলেমানুষি’ বা মহল বিশেষের ‘উসকানি প্রসূত’ বলে যারা উড়িয়ে দিতে চান, আসলে তারা সত্যকে পাশ কাটিয়ে যেতে চান।’’ তবে ছাত্ররাজনীতিকদের জন্য সতর্কবাণীও ছিল—‘তারা কোনো রাজনৈতিক দলের বি-টিম’ হিসেবে কাজ করবে না; এবং “ছাত্র ও যুবসমাজের নিরপেক্ষ স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি ও নিঃস্বার্থ ভূমিকার ঐতিহ্যকে অমলিন রেখেই তা [ছাত্ররাজনীতি] করতে হবে।” দুঃখজনকভাবে, এখন তো ছাত্ররাজনীতি মানেই জাতীয় রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি; ছাত্রসংগঠন এখন তো বি-টিম বই আর কিছু নয়।
মানিক মিয়ার রাজনৈতিক দর্শনে নেতৃত্ব প্রসঙ্গও আছে। তার দুটো মন্তব্য বেশ প্রাসঙ্গিক। যেমন, “ইতিহাসের ধারা নির্দিষ্ট খাতে প্রবাহিত হয়। ইতিহাস তার গতিপথে কোনো স্বেচ্ছাচার সহ্য করে না; কোনো অন্যায় ও অপরাধ ক্ষমা করে না।” আরো একটি মন্তব্য বেশ সরাসরি এবং ইঙ্গিতবাহী—‘‘দেশের যারা ‘কর্ণধার’, তাদের উদ্দেশে বলি, লৌহবর্মের আড়ালে দাঁড়িয়ে, ‘স্ট্রংম্যান’ হিসেবে পরিচিত হওয়ার চেয়ে মানুষের কাছে ‘মানুষের নেতা’ হিসেবে পরিচিত হতে প্রয়াসী হোন। দেখবেন, সব সমস্যার সমাধান আপনার-আমার সবারই নাগালের মধ্যে।’’
বলা বাহুল্য, দ্বিতীয় মন্তব্যটি ‘স্ট্রংম্যান’ আইউব খানকে ইঙ্গিত করে করা! মনে হয়, মানিক মিয়ার বিবেচনায় নেতৃত্ব মানে তা, যা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের পঙিক্ততে আছে—
মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক,
আমি তোমাদেরই লোক।
মানিক মিয়া সারা বিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করে তারুণ্যের অপরিমেয় এবং দুর্দম শক্তির ওপর আস্থাশীল ছিলেন; এবং তা তার উপলব্ধ সত্য ছিল। ১৯৬৩-র ৮ নভেম্বর, অনুষ্ঠিত ছাত্রলীগের সম্মেলনে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমরা যারা ঘটমান বর্তমানের মনোযোগী পর্যবেক্ষক তারা জানি, দিকে দিকে গণশক্তির অভূতপূর্ব জাগরণ ঘটেছে। এই জাগরণের সারথি হচ্ছে তারুণ্য...তরুণের দল। যুগ যুগ ধরে তাদের দ্বারাই অসাধ্য সাধন হচ্ছে। আমি দৃঢ় চিত্তে বিশ্বাস করি, এই দুরন্ত দুর্দম তরুণশক্তি কোথাও কোনো অন্যায়, অবিচার ও অসাম্যকে মেনে নেবে না।
‘এই পৃথিবীকে তারাই করে তুলবে সুন্দর, তারাই বাস্তবায়িত করবে আবহমানকালের মানুষের স্বপ্ন ও সাধের সমাজ।’ মানিক মিয়ার প্রতীতি ও উপলব্ধ সত্যজনিত কথাগুলো। ইতালি একত্রীকরণের জনক ম্যািসনিও এমনভাবে তারুণ্যের শক্তিতে আস্থাশীল ছিলেন। কিন্তু তারা, বিশেষ করে, মানিক মিয়া এখন বাংলাদেশে কি এমন কথা বলতে পারতেন? সংশয় আছে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, বাংলাদেশের তারুণ্য এখন ভুল রাজনীতির খপ্পরে পড়ে অপচয়িত ও অবক্ষয়িত। তাদের ঠিক পথে পরিচালিত করার নেতৃত্ব দৃশ্যমান নয়।
মানিক মিয়া ছিলেন শুধু সংবাদপত্রের নয়, মানুষের খ্যাতকীর্তি সাংবাদিক। সাংবাদিক হিসেবে মানিক মিয়ার হিমাদ্রিসম উচ্চতা আজও অনতিত্রম্য। এমন কারণসমূহ বিবেচনায় রেখে যশস্বী ব্যক্তিত্ব আবুল মনসুর আহমদ মানিক মিয়ার লোকান্তরণের পর যে লেখা লিখেছিলেন, তার শিরোনাম ছিল, ‘জাতি যে মানিক হারাইল।’
উল্লেখ্য, মানিক মিয়াকে চিনেছিলেন ও বুঝেছিলেন তিন জন—সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু ও আবুল মনসুর আহমদ; তিন জনের কাছেই তিনি ছিলেন ‘মানিক’।
আমরা কি মানিক মিয়ার ‘মানিকত্ব’ চিনেছি বা বুঝেছি?
লেখক : চেয়ার অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চেয়ার, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)