স্বামীর নাম গ্রহণের প্রেক্ষাপট

পরিচিত এক বান্ধবী বিয়ের পর তার স্বামীর নাম বা পদবি নেওয়ার ঘোর-বিরোধী ছিল। তার স্বামীও বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামায়নি অত। কিন্তু দুই বছর পর যখন তাদের একটি ফুটফুটে সন্তান হলো, তখন সবকিছু বদলে গেলো। সন্তানের কথা মাথায় রেখে তাদের দুজনের নাম ও পদবি মিলিয়ে নিতে হলো। সঙ্গত কারণে নামটি উল্লেখ করতে পারছি না। দুই বছর পর আমার বান্ধবীকেও বিষয়টি নিয়ে কিছুটা খুশি মনে হলো। 

সাংস্কৃতিক অধ্যয়নের শিক্ষার্থী হওয়ায় বিষয়টি আমার কাছে বেশ কৌতূহলের কারণ হয়ে উঠলো। কারণ বিয়েকে কেন্দ্র করে অনেক প্রথা বা সাংস্কৃতিক প্রবণতা গড়ে ওঠে। কিন্তু বিয়ের পর স্বামীর শেষ নাম বা পদবি নেওয়ার প্রবণতা শুরু হলো ঠিক কবে? বিষয়টিকে শুধু পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চাপিয়ে দেওয়া বিষয় ভাবলে ভুল হবে। কারণ এরসঙ্গে ঐতিহাসিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ও জড়িয়ে আছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০-১০০০ অব্দের ইউরোপে অন্ধকার যুগ চলছে। ওই সময় মানুষের নাম অত গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কিন্তু মধ্যযুগে শিক্ষাবিস্তারের ফলে নামের একটি আলাদা গুরুত্ব তৈরি হয়। বিশেষত সামাজিক পর্যায়ে  আইনের বাস্তবায়নে নাম লিপিবদ্ধ করা কিংবা তথ্য হিসেবে সংগ্রহের চল শুরু হয়। এক্ষেত্রে নারীকে পরিবারের সদস্য হিসেবে স্বামীর পদবি ধারণ করতে হয়েছিল। সেটি মধ্যযুগের  প্রয়োজনে। কিন্তু আধুনিক সময়ে নারীকে কেন এই অভ্যাসের ভেতর চলে আসতে হবে? এই প্রশ্নটি বিবেচনার দাবি রাখে। 

নারী

সমীক্ষায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭০ শতাংশ নারীই বিয়ের পর তাদের স্বামীর নাম গ্রহণ করে থাকেন। ব্রিটেনে সংখ্যাটি আরও বেশি। সেখানে প্রায় ৯০ ভাগ  নারী বিয়ের পর নিজের নামের সঙ্গে স্বামীর নাম জুড়ে নেয়। এই নারীদের মাঝে ৮৫ ভাগের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মাঝে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কিছুটা পার্থক্যের কারণে হলো, এই দু’দেশে নারীবাদের সংজ্ঞায়নের তারতম্য। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে যেসব নারীর বয়স ৩০ বছরের নিচে, তাদের মধ্যে শতকরা ৬৮ ও ৬০ ভাগ নিজেদের নারীবাদী বলে দাবি করেন। যুক্তরাজ্যে নারীবাদের বিকাশ পুরোপুরি সমাজে নারীর অবস্থান ও শ্রমের মূল্যায়নের ভিত্তিতে করা হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নারীবাদকে অ্যাকাডেমিক পর্যায়ে আটকে রেখেছে। নারীবাদকে এই দুই অঞ্চলে যেভাবে দেখা হয় তার পার্থক্যটি অনুভব করা জরুরি। একই কথা আমরা বলতে পারি এশিয়ার ক্ষেত্রে। তবে এশিয়ার ক্ষেত্রে পদবি ধারণের বিষয়টি এত জরুরি না। গ্রামীণ পর্যায়ে সে স্বামীর পদবি ধারণ না করে তার নামটিরই বিলোপ সাধন করে বসে। এশিয়ায় গ্রামীণ এক নারী ‘অমুক বাড়ির বউ’ বা ‘অমুক মিয়ার বেটার বউ’ নামে পরিচিত হয়ে আসছে বহুকাল ধরে। তার নামটিও অনেক সময় আমাদের অজানা থেকে যায় নানা কারণে। 

আধুনিক সময়ে অন্তত মধ্যযুগের এই প্রবণতা মেনে নেওয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে না। তাও এখনো টিকে আছে। বিশেষত ইউরোপে। পশ্চিমা রাষ্ট্রের কিছু অভ্যাস আমরাও গ্রহণ করেছি। তবে তা না বুঝে। নারী স্বামীর পদবি কেন নেয়? এর পেছনে সামাজিক কারণটি আগেই বলা হয়েছে। একজন নারী আইনিভাবে একটি পরিচয় লাভের জন্যই মূলত স্বামীর নাম নেয়। আইনি ও আমলাতান্ত্রিক নিয়ম তাকে এই নাম নিতে আশ্বস্ত করে। একসময় আইনি প্রক্রিয়াকে সে মেনে নেয়। যেহেতু আইনি প্রক্রিয়া বা কাঠামোর ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা লিঙ্গভিত্তিক ধারণার প্রয়োগ করা যায় না তাই তার কাছে বিষয়টি অত গুরুত্বপূর্ণ ও বৈষম্যমূলক মনে হয় না। অথচ আমরা ভুলে যাই সব নিয়ম ও সামাজিক কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে পুরুষতন্ত্র দ্বারা নির্ধারিত। এখানে পুরুষতন্ত্র বলতে শুধু পুরুষকেই বোঝায় তা কিন্তু নয়। পুরুষতন্ত্র ধারণার ব্যাপ্তি আরও বিস্তৃত। 

নারী

একজন নারী তার পূর্ণ স্বাধীনতা এখনো পুরোপুরি ভোগ করতে পারেন না। তাকে স্বামীর নাম নিতে হয় কারণ আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এই স্বামীর উপস্থিতিই মুখ্য। আজো ব্যাংকে একজন নারী ঋণ বা সেবা নিতে গেলে বাবা কিংবা স্বামীর পরিচয় দিতে বাধ্য হয়। সন্তানের পরিচয় সে একা ধারণ করতে পারে না। মধ্যযুগের ওই আইনি কাঠামো তাকে এখনো অনুসরণ করতে হয়। সামাজিকভাবে সূক্ষ্ম পর্যায়ে এখনো অনেক বিষয় কাঠামোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। করোনাকালে আমরা দেখেছি, নারী উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন। আবার ব্যাংক বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে তারা সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বামীর নামটি ব্যবহার করতে হয়েছেই। এমন অনেক খবর পাওয়া যাবে যেখানে স্বামী তার স্ত্রীর ঋণ জবরদস্তির মাধ্যমে নিয়ে গেছেন। সে উদ্যোগ নেওয়ার আগেই তা থেমে গেছে। এসব মিলিয়ে দেখা যাবে, নারীর ভূমিকা তার পরিচয়ের কারণে অনেকটুকু থমকে আছে। এই থমকে থাকাটাকে কি মেনে নেওয়া যায়? অবশ্যই না। এই সময়ে আমরাও আস্তে আস্তে এই পদবি নেওয়ার বিষয়টিকে গ্রহণ করছি। কিন্তু এর প্রেক্ষাপট স্বস্তিদায়ক নয়। এখনো নারীর শ্রম অবমূল্যায়িত। শুধু তাই নয়, কাঠামোগতভাবে নারী পিছিয়ে আছে। সেসব বিবেচনায় সময় এসেছে বদলানোর। ভাবনাকে বদলানোর। বিষয়টি নিয়ে ভাবার।