অপেক্ষার পালা শেষ। সবখানেই কৌতূহল আজকের ভোট নিয়ে। বিজয়ের শেষ হাসি হেসে কে হবেন নগর পিতা—এমন প্রশ্ন দেখা গেছে দিনভর নগর জুড়ে। ভোটার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ একে অপরকে জিগ্যেস করছিলেন, নির্বাচন নিয়ে কী মনে হচ্ছে? কে হবেন? মেয়র পদে বিজয়ী হতে গতকাল শেষ দিনেও প্রার্থীরা প্রাণান্তকর চেষ্টা থেকে পিছপা হননি। তারা ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। দিনভর প্রার্থীদের নিয়ে নানান গুজব চলে নগর জুড়ে।
- নৌকার জয় নির্ভর করছে দলীয় কোন্দল নিরসনের ওপর
এদিকে, নির্বাচনে নৌকার জয়-পরাজয় নির্ভর করছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনের ওপর। সদ্যসমাপ্ত গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের নৌকার পরাজয়ের কারণ মাথায় নিয়ে বরিশালে মাঠে কাজ করেছে আওয়ামী লীগ। দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশে কেন্দ্রীয় কমিটির প্রায় অর্ধশতাধিক নেতা বরিশালে অবস্থান করে সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়েছেন। মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে চাচা-ভাতিজার বিরোধ যেন ভোটারদের ওপর প্রভাব না ফেলে, এমনকি স্থানীয় নেতাকর্মীরা যেন নৌকা মার্কায় বিমুখ না হয়, সেটা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে কেন্দ্রীয় নেতারা। ভোটের দিন নির্বাচন কমিশনের বিধিনিষেধ মেনে নির্বাচন মনিটরিং করবেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, বরিশাল সিটির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একটি পক্ষ, যারা বর্তমান মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর অনুসারী, তারা দলের মেয়র প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নামেননি। তারা এক ধরনের ‘কৌশল’ অবলম্বন করে নিষ্ক্রিয় রয়েছে। গত শুক্রবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আবুল খায়ের আবদুল্লাহ বলেছিলেন, যদি কেউ নৌকার পক্ষে কাজ না করে এটা তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। গতকাল নগরীর সদর রোডস্থ আওয়ামী লীগ প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বড় ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও ভাতিজা বর্তমান মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর ভূমিকা কী হতে পারে, সে বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমি দুঃখিত। এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। আমার কোনো বক্তব্য নেই। তবে আবুুল খায়ের আবদুল্লাহ গত কয়েক মাস ধরে সাধারণ ভোটারের কাছে গিয়ে তাদের মন জয়ের চেষ্টা করেছেন। নগরীর ব্যবসায়ী মহল থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের কাছে গিয়ে তিনি একটি সুন্দর নগরী গড়ে তোলার আশ্বাস দিয়েছেন। অনেকেই মনে করছেন, তার ক্লিন ইমেজ ও ভোটারের কাছে করা অঙ্গীকারের কারণে তিনি নির্বাচনে বিজয় লাভ করতে পারেন।
দলীয় কোন্দলের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের নেতারা জানান, আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের দুটি টিম বরিশালের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নির্বাচন পর্যন্ত সাদিক আবদুল্লাহকে বরিশালে না যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
গতকাল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও নির্বাচন সমন্বয়ক টিমের সদস্য অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন বলেন, নৌকা প্রতীকের অবস্থা খুবই ভালো। তিনি বলেন, বরিশাল আওয়ামী লীগে কোনো বিভক্তি নেই। কিছু ভুল বোঝাবুঝি ছিল, তবে কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যস্থতায় তা নিরসন করা হয়েছে। এখন সবাই নৌকার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।
নৌকার প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণার জন্য ৯ সদস্যের একটি টিম গঠন করে কেন্দ্রীয় কমিটি। অন্যদিকে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণার লক্ষ্যে যুবলীগও নির্বাচন পরিচালনা ও সমন্বয়ক টিম গঠন করে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের পঞ্চম নির্বাচন আজ। নগরীর ২ লাখ ৭৬ হাজার ২৯৮ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে একজন নগর পিতা, ৩০ জন কাউন্সিলর ও ১০ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর নির্বাচিত করবেন। মোট ভোটারের মধ্যে নারী ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮০৯ জন ও পুরুষ ১ লাখ ৩৭ হাজার ৪৮৯ জন। ১২৬টি কেন্দ্রের ৮৯৪টি কক্ষে ভোগ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ১২৬ জন প্রিজাইডিং অফিসারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি কক্ষে একজন করে মোট ৮৯৪ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন।
- ‘বরিশালে হবে ভোট উৎসব’
বরিশাল সিটি করপোরেশনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়াতে, ভোট উৎসব হবে। প্রথম বারের মতো এবার বরিশালের সবগুলো কেন্দ্রে ইভিএম মেশিনে ভোট গ্রহণ হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ১২৬টি কেন্দ্রের ৮৯৪টি বুথের জন্য দেড় হাজার ইভিএম মেশিন রাখা হয়েছে। রবিবার ইভিএম মেশিনসহ নির্বাচনি সামগ্রী প্রিজাইডিং অফিসারদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে স্ব স্ব কেন্দ্রে চলে যান প্রিজাইডিং অফিসাররা। এছাড়া ১২৬টি ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রায় ১ হাজার ২০০ সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে বলে তিনি জানান।
- আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন করা হয়েছে সাড়ে ৪ হাজার সদস্য
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. সাইফুল ইসলাম জানান, এবারের সিটি নির্বাচনে মোট ১২৬টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১০৬টি কেন্দ্রকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়েছে। তিনি বলেন নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করতে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, এপিবিএন, ব্যাটালিয়ন আনসার, কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশের সাড়ে ৪ হাজার হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। পুলিশ কমিশনার বলেন, নগরীতে আমরা কোনো বহিরাগত দেখতে চাই না।
- বরিশাল সিটি নির্বাচনে সাত মেয়র প্রার্থী কে কোথায় ভোট দেবেন
আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত নগরীর কালীবাড়ি সরকারি বরিশাল কলেজ কেন্দ্রে, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস গোরস্থান রোডের সৈয়দ আব্দুল মান্নান ডিডিএফ আলিম মাদ্রাসা কেন্দ্রে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম নগরীর রূপাতলী হাউজিং আ. রব সেরনিয়াবাত মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে, জাকের পার্টির গোলাপ ফুল প্রতীকের মেয়র প্রার্থী মো. মিজানুর রহমান বাচ্চু ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের চহুতপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেবেন। এছাড়া টেবিলঘড়ি প্রতীকের স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী কামরুল আহসান রুপন কালুশাহ সড়কের আলেকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে, হরিণ প্রতীকের স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী মো. আলী হোসেন হাওলাদার ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের চহুতপুর ইস্কান্দার শরীফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, হাতি প্রতীকের স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী মো. আসাদুজ্জামান বরিশাল নগরীর সদররোডের সিটি কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেবেন।
- উন্নয়নের প্রশ্নে বিএনপির সমর্থকরাও আমাকে ভোট দেবেন : নৌকার মেয়র প্রার্থী
আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ (খোকন সেরনিয়াবাত) বলেছেন, সবকিছু মানুষে মানুষে পার্থক্য করে। বিজয়ী হলে বরিশালের উন্নয়ন করার নিশ্চয়তা আমি দিয়েছি। যার কারণে জনগণ আমাকে ভোট দেবে বলে, আমি বিশ্বাস করি। সেই সঙ্গে বিএনপির সমর্থকরাও মনে করছে আমাকে ভোট দিতে পারলে নগরবাসী সেবা পাবে। দলমত নির্বিশেষে সকল মানুষ আমাকে ভোট দেবে এবং স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ভোট দেবে। রবিবার বেলা দেড়টায় নগরীর সদররোডস্থ আওয়ামী লীগ প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এ কথা বলেন তিনি। সংবাদ সম্মেলন তার প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দারসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
- সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জানিয়ে জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থীর সংবাদ সম্মেলন
লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস বলেছেন, নির্বাচন কমিশনকে বারবার আমি বলেছি, বরিশাল শহর বহিরাগততে ভরে গিয়েছে। একজন বহিরাগতও সরায়নি পুলিশ। আওয়ামী লীগের বন্ধুরা বিভিন্ন বস্তিতে গিয়ে বস্তি ঘেরাও করে ভোটারদের টাকা দিচ্ছে। তিনি সুষ্ঠু ভোটের জন্য নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ আচরণ করার আহ্বান জানান।
- ভিডিও বার্তায় যা বললেন মুফতি ফয়জুল
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মুফতি ফয়জুল করীম ভিডিও বার্তায় বলেছেন, ভোটারগণ কোনো অপপ্রচারে কান দেবেন না। সকাল সকাল সবাই ভোটকেন্দ্রে চলে আসবেন। ইনশাআল্লাহ নিশ্চিতভাবে আপনার ভোট প্রদান করতে পারবেন। আপনি আপনার ভোট দেবেন ভোট দেওয়ার দায়িত্ব আপনার, আর সংরক্ষণ করার দায়িত্ব আমাদের।