ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল : ভূরাজনীতির পীঠভূমি

ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে ঘিরে যেসব দেশ রয়েছে সেগুলোকে একত্রে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বলা হয়। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে; রয়েছে জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও বাংলাদেশের মতো ডজনখানেক দেশ। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর পাশাপাশি রয়েছে অনেক উঠতি অর্থনৈতিক পরাশক্তির দেশ। ফলে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ও উঠতি উদীয়মান শক্তিধর দেশের মেলবন্ধনে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বিশ্বব্যাপী আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে বর্তমানে। তাছাড়া অর্থনীতি তথা আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্য এবং প্রযুক্তিগত কর্মকাণ্ডসহ ব্যাপক সমরাস্ত্রসজ্জিত মহড়ার দরুন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল পরিণত হয়েছে  বৈশ্বিক ভূরাজনীতির বড় বিজ্ঞাপনে।

বর্তমানে বিশ্বরাজনীতি হয়ে পড়েছে কৌশলগত পরিকল্পনা ও প্রক্রিয়ানির্ভর। অস্ত্রের ঝনঝনানি, ক্ষমতার দাবানলের পাশাপাশি বিশ্বের ক্ষমতাধর পারমাণবিক দেশগুলো নিজেদের কূটনৈতিক কৌশলে বেশ পরিবর্তন এনেছে। তাছাড়া গত বছর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পর থেকে বিশ্বের প্রতিটি দেশ নিজেদের কূটনৈতিক কৌশলের পাশাপাশি নিজেদের নিরাপত্তা বৃদ্ধিকরণে সামরিক খাতকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায়। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও এর বত্যয় ঘটেনি। এই অঞ্চলের দেশগুলোও নিজেদের নিরাপত্তা জোরদারে এককাট্টা।

বিশ্বের একক সুপার পাওয়ার হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবে এখন ভাগ বসাতে বেশ তত্পর বেইজিং। বলা হচ্ছে, অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও সামরিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বা বিশ্বরাজনীতির দৃশ্যপটের কেন্দ্রে অবস্থান নিতে চায় চীন। সেই লক্ষ্যে কূটনৈতিক কৌশলকে ঢেলে সাজাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এর ছাপ দেখতে পাওয়া গেছে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের সরব উপস্থিতি এবং সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক পুনরায় চালুকরণে দেশটির মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ১২ দফা শান্তিচুক্তির প্রস্তাব প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে।

গত কয়েক দশক বিশ্ব শাসনের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানিস্তানে ওয়াশিংটনের প্রভাব ছিল আকাশচুম্বী; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে সেই দিক সরে এসে আজ তাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০২১ সালে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি (আইপিএস) ঘোষণা করে, যেখানে তারা দেখিয়েছে, ইন্দো-প্যাসিফিক দেশগুলোতে যে জনসংখ্যা, তা বৈশ্বিক জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি, যার ৫৮ শতাংশই আবার তরুণ। কর্মশক্তি ও ভোক্তা—দুই হিসাবেই সংখ্যাটা বিশাল। এখানকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক অর্থনীতিরই দুই-তৃতীয়াংশ, জিডিপির পরিমাণ হচ্ছে বৈশ্বিক জিডিপির ৬০ শতাংশ। এ ছাড়া বিশ্বে যে সমুদ্র আছে, তার ৬৫ শতাংশ পড়েছে ইন্দো-প্যাসিফিকে, ভূমির ক্ষেত্রে যেটা ২৫ শতাংশ। সবমিলিয়ে এই অঞ্চল হয়ে উঠছে বৈশ্বিক রাজনীতির আগ্রহের কারণ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে আইপিএস তৈরি করে, সেখানে তারা জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, ফিলিপাইন ও বাংলাদেশসহ বেশ কিছু দেশকে নিয়ে একটি ‘নিরাপদ ও অংশগ্রহণমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল’ তৈরি করার আশা ব্যক্ত করে। লক্ষণীয়, সেখানে তারা চীনকে অন্তর্ভুক্ত করেনি। উপরন্তু চীনকে তারা এই অঞ্চলের জন্য ক্ষতিকর, আগ্রাসি মনোভাবসম্পন্ন হুমকিস্বরূপ অভিহিত করে আসছে। এর কারণ, এই অঞ্চলে তাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা চীনের সঙ্গে। যদিও চীনের অভাবনীয় উত্থানের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই  অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নেওয়া সহজসাধ্য হবে না। তাছাড়া চীন যদি এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসে, তাহলে বিশ্ব ব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কিছুটা হলেও খর্ব হতে পারে।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিটি দেশ নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ নিয়ে বেশ ভালোমতোই অবগত। আর এই নিরাপত্তার প্রশ্নকে কাজে লাগিয়েই এই অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণবলয় তৈরি করতে চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আরো সুসংহত করতে চায় নিজেদের অবস্থান। তবে বাস্তবতা হলো—দিনশেষে কোনোভাবেই এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব দেখতে চাইবে না চীন। ফলে দুই পক্ষের পালটাপালটি স্নায়ুযুদ্ধে আগামী দিনে আরো সরগরম হয়ে উঠতে দেখা যাবে বিশ্বরাজনীতির এই বৃহত্ ময়দানকে। সব মিলিয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়ে চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে শেষ অবধি নতুন কোনো উত্তেজনা ডেকে আনে কি না, তাই আজকের দিনে বিশেষ চিন্তার বিষয়!

লেখক : শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়