বছর ঘুরে আবারও এলো টক-মিষ্টি স্বাদের ফল লটকনের মৌসুম। সেই লটকনের স্বাদ পেতে ও সৌন্দর্য দেখতে ঈদের পরদিন দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা ছুটলাম ঢাকার পাশেই নরসিংদীর উদ্দেশে। রায়পুরার বাসিন্দা কাজল ভাই শিবপুরের সৃষ্টিগড় বাসস্ট্যান্ডে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
ঈদের ছুটিতে ঢাকা শহর ফাঁকা থাকলেও কাঁচপুর ব্রিজ থেকেই যানজটের যন্ত্রণা পেয়ে বসল। দু ঘণ্টায় পৌঁছানোর কথা, অথচ পৌঁছাতে সময় লাগল তিন ঘণ্টার উপরে। বেচারা কাজল ভাইয়ের চেহারা রোদে পুড়ে লাল হয়ে গেছে। তবুও আমাদের পেয়ে বেজায় খুশি হলেন। কুশল বিনিময় শেষে যেতে চাইলাম মরজাল। কিন্তু একরকম জোর করেই তিনি নিয়ে গেলেন তাঁর বিয়াইবাড়ি। অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেতে হলো। গাড়ি রেখে বাড়িতে ঢুুকতেই চোখ সবার কপালে। আরে এটা তো বসতবাড়ি নয়, যেন ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশেলে তৈরি কোনো বনেদি কটেজ। বাড়ির আঙ্গিনায় হরেকরকম ফল ও ফুলের গাছ। কাঁচা-পাকা লটকন আর বিশাল বিশাল সাইজের কাঁঠাল ঝুলছে। কাজল ভাইয়ের বিয়াই প্যারা মেডিকেল ডাক্তার আ. কাইউম ভূঞা। খুব অতিথিপরায়ণ মানুষ। নানা পদের পিঠা আর সদ্য পাড়া লটকন নাশতার টেবিলে পরিবেশন করলেন। এসবের স্বাদ নিয়ে গেলাম লটকার রাজ্য বটেশ্বর গ্রামে। সেখানেও অপেক্ষায় আছেন তরুণ কলেজ শিক্ষক ট্র্যাভেলার কবির ভাই।
তাঁর নিজস্ব লটকন বাগান আছে সেখানে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক থেকে বাম দিকের মরজালের সরুপথে গাড়ি ঢুকতেই চোখে ধরা দিল অন্যরকম প্রকৃতি। যতই এগোলাম, ততই যেন মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। পিচঢালা সরু সড়কের দু পাশে নানা ফল আর সবজির ক্ষেত। জয়নগর চৌরাস্তার মোড় থেকে বটেশ্বর গ্রামের পথটাতে যেতে যেতে যেন মনে হলো যেন লটকনের রাজ্যে এসে পড়েছি। নরসিংদী জেলা নানা ফল আর সবজির জন্য বেশ বিখ্যাত। তবে এর দুটো উপজেলা বেলাব ও শিবপুরে লটকন বেশি ফলে। তার মধ্যে বটেশ্বর, লাখপুর, আজলিতলা, ওয়ারি ও মরজাল বেশ প্রসিদ্ধ।
আধা ঘণ্টার মধ্যেই কবির ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো। তিনিও মোটরবাইকে কিছুটা পথ এগিয়ে এসে তিন রাস্তার মোড় বটেশ্বর বাজারে অপেক্ষায় ছিলেন। ট্রাভেলার্স নরসিংদীর অ্যাডমিন তমালের সূত্রে কবির ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়। তিনিও প্রথমে তাঁর বাড়িতে নিয়ে পিঠা-পুলি, কাঁঠাল, লটকন দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। এই গ্রামের প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনায় আছে লটকন গাছ। কোনো কোনো গাছে ৩১৫ কেজি পর্যন্ত লটকন ফলে। এসব গ্রামের অধিকাংশ পরিবারই লটকন ফল বিক্রির ওপর নির্ভরশীল। লটকন ফলের জন্য ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও নরসিংদী জেলা বেশ বিখ্যাত। তবে অন্য দুই জেলার চেয়ে নরসিংদীর লটকন আকার ও স্বাদে বড় ও সুস্বাদু। মরজাল হলো লটকনের বৃহত্ পাইকারি বাজার। লটকন কেনার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে পাইকাররা আসেন। বর্তমানে দেশের চাহিদা মিটিয়ে লটকন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। লটকন ফল জুন থেকে আগস্ট ফলে। লটকনে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি। অন্যান্য ফলের চেয়ে লটকনে আয়রনের পরিমাণও বেশি।
মাত্র এক দশক আগেও অনেক জেলার মানুষের কাছে লটকন জংলি ফল হিসেবে পরিচিত ছিল। এই ফল গাছের গোড়া থেকে মগডাল পর্যন্ত থোকায় থোকায় ধরে থাকে। কাঁচা অবস্থায় এ ফলের রং সবুজ আর পাকলে হলদে। লটকন ফলের নাম নানা জেলায় নানারকম। যেমন :লটকা, ডুবি, ভুবি প্রভৃতি। নেত্রকোনা জেলার মানুষ তো একসময় লটকন ফলকে ‘পাগলা গোটা’ হিসেবে আখ্যায়িত করতেন। এখন সেই পাগলা গোটা বা ভুবি বিক্রি করে অনেকেই সংসার চালান। সময়ের আবর্তনে লটকন এখন বাণিজ্যিক একটি ফল। দিন শেষে আমরাও নানা গাছের লটকন চেখে, একশ টাকা দরে কিনে বাড়ি ফেরার পথ ধরলাম।
যাবেন যেভাবে
ঢাকার সায়েদাবাদ বা উত্তরা থেকে নরসিংদীর মরজাল বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত পরিবহনভেদে জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৮০ থেকে ১১০ টাকা। কমলাপুর থেকে ট্রেনেও মরজাল রেলস্টেশনে নামা যায়। মরজালে অটো বা রিকশায় ঘুরে বেড়াতে পারবেন লটকন বাগান।
ছবি :দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ