দেশে বাড়ছে সাক্ষরতার হার, যা এখন প্রায় ৭৫ শতাংশ। এটা অবশ্যই একটি গর্বের বিষয়। কিন্তু সেই সঙ্গে বাড়ছে বেকারত্বের হারও। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লিখিত শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যনুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে আগের তিন মাস, অর্থাত্ ২০২২ সালের শেষ প্রান্তিকের তুলনায় দেশে বেকার লোকের সংখ্যা ২ লাখ ৭০ হাজার বেড়েছে। চলতি বছরের মার্চ মাস শেষে দেশে বেকার ছিল ২৫ লাখ ৯০ হাজার মানুষ। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে সেই সংখ্যা ছিল ২৩ লাখ ২০ হাজার।
বাংলাদেশের আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা অনেক। আয়তনে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশ রাশিয়া হলেও ঘনত্বের দিক থেকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা রাশিয়ার চাইতেও বেশি। বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে, কিন্তু বেকারত্বের হারও সমানতালে বাড়ছে। তার কারণ ঘরে ঘরে এখন অনার্স-মাস্টার্স পাশ। সবাই সাধারণ শিক্ষামুখী। কিন্তু সে তুলনায় চাকরির বাজার খুবই স্বল্প। একজন শিক্ষার্থী যিনি সবেমাত্র ইউনিভার্সিটির গণ্ডিতে পা রেখেছেন, তাকে যদি জিগ্যেস করা হয় পড়াশোনা শেষে তিনি কী করতে চান? তাহলে কি মুখস্থ করা এক কথায় প্রশ্নের উত্তরের মতো করে বলবেন—একটা সরকারি চাকরি। তিনি প্রথম বর্ষ থেকেই বিসিএস বা সরকারি চাকরির মোটা মোটা বই নিয়ে লাইব্রেরি বা রিডিং রুমে তার বেশির ভাগ সময়টা কাটান। তাকে একটা সরকারি চাকরি জোগাড় করতেই হবে। নাহলে তিনি সমাজে একজন অবাঞ্ছিত ব্যক্তিতে পরিণত হবেন। এটাই আমাদের দেশের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর বর্তমান অবস্থা।
আমাদের চারপাশের পরিবেশও আমাদের এই বার্তাই দিচ্ছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের প্রথম দিকেই যখন শিক্ষকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় যে, কে কী হতে চাও পড়াশোনা শেষ করে, তখন ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীরই উত্তর ছিল—হয় বিসিএস, নয়তো একটা সরকারি চাকরি। আর ৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর উত্তর ছিল একটা ভালো বেতনের চাকরি হলেই হবে। বাকি ১ শতাংশ শিক্ষার্থীর উত্তর ছিল হয় উদ্যোক্তা হওয়া, নয়তো গবেষণাধর্মী কাজ করা। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, শিক্ষার্থীদের উত্তর শোনার পর শিক্ষকগণ সেই ৯৯ শতাংশ শিক্ষার্থীকেই বিভিন্ন রকমের পরামর্শ দেন যে, কীভাবে কী করলে একটা ভালো চাকরির আশা করা যায়। অথচ একটা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে উদ্যোক্তা এবং গবেষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য যেটা অনেকাংশেই উপেক্ষা করা হচ্ছে বলা যায়। যার ফলে এক ১ শতাংশ শিক্ষার্থীর অনেকেই বাকি ৯৯ শতাংশ শিক্ষার্থী খাতায় নাম লেখাচ্ছে নয়তো তাদের গন্তব্য হচ্ছে বিদেশ। আর আমরা প্রতিদিনই বিদেশি বাংলাদেশিদের অভাবনীয় অর্জনগুলো দেখি আর গর্ববোধ করি। অথচ ভেবে দেখি না যে, এই কাজগুলো তারা এই দেশে থেকেও করতে চেয়েছিল।
অনেকেই বলেন যে, বাংলাদেশের বেকারত্বের পেছনের মূল কারণ হচ্ছে পর্যাপ্ত জনসংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে পর্যাপ্ত চাকরিদাতা কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখনো বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। কথাটা অনেকাংশেই সত্যি। তবে এসব চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের ভাষ্যমতে, চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি হলেও প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তি খুবই কম। ফলে আকাঙ্ক্ষিত দক্ষ ব্যক্তির হদিস পেতেও তাদেরকে অনেক হিমশিম খেতে হচ্ছে। হবে নাই-বা কেন? দিনরাত চাকরির জন্য সাধারণ জ্ঞানের বই পড়ার পর দক্ষতাবৃদ্ধির সময় কোথায়? অবশ্য দক্ষতা বৃদ্ধি করলেই যে সবাইকে চাকরি দেওয়া সম্ভব হবে, এরই-বা নিশ্চয়তা কোথায়? বাংলাদেশে কী আদৌ পর্যাপ্ত চাকরির বাজার আছে? এছাড়াও রয়েছে সরকারের সদিচ্ছার অভাব। তরুণদের নিয়ে উচ্চমহলে তেমন কোনো ভাবনা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। নেই তেমন কোনো উত্পাদনশীল শিল্পপ্রতিষ্ঠানও। এরকম তথৈবচ অবস্থা নিয়ে বেকারত্ব বাড়বে না কমবে, তা সহজেই অনুমেয়।
তাহলে এই বেকারত্ব সমস্যার সমাধানের উপায় কী? এর সর্বজনস্বীকৃত সমাধান হলো উদ্যোক্তা তৈরি করা। সেটা সম্ভব হলেই দেশে ২৫ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষিত বেকার নয়, ২৫ লাখ ৯০ হাজার উদ্যোক্তা তৈরি হবে। জনশক্তিতে রূপান্তরিত হবে এই মানুষগুলো যেমনটা ঘটেছিল চীনে। তবে এটা কোনো মুখের কথা নয়। এর জন্য সরকারের উদ্যোক্তাবান্ধব নানারকম প্রকল্প হাতে নিতে হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ নানা প্রকল্পে দেশীয় উদ্যোক্তাকে বেশি বেশি সুযোগ প্রদান করতে হবে। তবেই বর্তমান তরুণ প্রজন্ম উদ্যোক্তা হতে এবং উদ্যোক্তা তৈরি করতে উত্সাহী হবে।
এছাড়া শিক্ষা এবং গবেষণা খাতে আরো নজর দিতে হবে। কেননা, পর্যাপ্ত গবেষণাবান্ধব পরিবেশ না থাকলে দেশের উন্নয়ন এক পর্যায়ে স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। সর্বোপরি শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে সমাজের অংশ হিসেবে আমাদেরও নিজেদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সরকারি চাকরি মানেই সাফল্য নয়।
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়