মূল্যস্ফীতি ও নতুন মুদ্রানীতি

গত মে মাসে আমাদের মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। অর্থাত্, ১০ শতাংশের কাছকাছি। এই মূল্যস্ফীতির কারণে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। এজন্য প্রস্তাবিত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে ধরে রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু বাজেট দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, এর জন্য মুদ্রানীতিরও একটি গঠনমূলক ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। এই উদ্দেশ্যে গতকাল রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর তার মেয়াদে দ্বিতীয় বারের মতো ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের জন্য ঘোষণা করলেন মুদ্রানীতি।

নতুন মুদ্রানীতিতে কী রয়েছে? এই মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে রেপো হার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে। এতে এই হার ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে হবে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। সেই সঙ্গে রিভার্স রেপো হার ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়িয়ে ৪ দশমিক ২৫ থেকে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গত বছর থেকেই রেপো হার বাড়াতে শুরু করে। তখন থেকেই বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণের সুদহারের সীমা তুলে নেওয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তাই এবার মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার বাড়ানোর কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদহারের সীমাও তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর ফলে এখন প্রতিযোগিতামূলক ও বাজারভিত্তিক সুদহার কার্যকর হবে, যদিও তার মার্জিন থাকবে। সমাজে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহের রাশ টেনে ধরতে এই মুদ্রানীতি ঘোষণার বিকল্প ছিল না।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে নির্দেশ দেন। অন্যদিকে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতি কমাতে সময় লাগবে। এ কথা সত্য, নিত্যপণ্যের বর্তমান দামের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সব স্তরের মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে। চাল-ডাল-তেল থেকে শুরু করে অতি প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দামের একই অবস্থা। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে সয়াবিন তেলের দাম ছিল প্রতি লিটার ১০৪ টাকা, যার বর্তমান মূল্য ১৮০ টাকা। দুই বছরের ব্যবধানে গড়ে চালের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ১৫ টাকা, ডাল ২০ টাকা। ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ২০১৯ সালে ছিল ৮৫০ টাকা; বর্তমান দাম ১৩৯১ টাকা।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালপ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনা মহামারির কারণে বিশ্ব জুড়ে প্রতি দুই জনের মধ্যে এক জনের আয় কমেছে। এদিকে মূল্যস্ফীতির প্রভাবে করোনাকালে বাংলাদেশের অর্জনগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে ম্লান হতে বসেছে। ২০২০-এর করোনা মহামারির মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন করা তিন দেশের একটি ছিল বাংলাদেশ। করোনার ধাক্কা অন্যান্য দেশ থেকে অনেক দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করার পরেও এই সময়ে দারিদ্র্যের হার করোনা-পূর্ব ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশ হয়েছে। বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে কিছু সময়ের জন্য হলেও বেকার থাকতে হয়েছে। আবার কাজ করলেও ৬৩ শতাংশের আয় কমেছে।

বাস্তবতা হলো, মূল্যস্ফীতির এই চিত্র শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয় বরং এটি এখন বৈশ্বিক সমস্যা। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থা এফএওর জরিপমতে, ২০১১ সালের পর বিশ্বব্যাপী বর্তমানে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। গত দুই বছরের ব্যবধানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশ। আইপিএসওএসের জরিপমতে, গত ছয় মাসের ব্যবধানে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বেড়েছে গড়ে ৫৯ শতাংশ, যার সর্বোচ্চ আর্জেন্টিনায় ৭৯ শতাংশ। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকায় ৭৩ শতাংশ, ভারতে ৫৮ শতাংশ, আমেরিকায় ৫৬ শতাংশ এবং চিনে ৩৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ঘটেছে। বাংলাদেশে গত মে মাসে যে মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায়, তা ১১ বছর তিন মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বাড়ার পাশাপাশি ডলারের সংকটের কারণে মূল্যস্ফীতির প্রবণতা আমাদের দেশে আরো বেড়েছে। গত বছরের মে মাসে যে এক ডলার ছিল ৮৬ টাকা, তা এখন ১০৯ টাকা।

বিশ্বব্যাপী নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ার পেছনে যথেষ্ট কারণও রয়েছে। শুরু করা যাক, সাপ্লাই চেইন দিয়ে। সাপ্লাই চেইনকে উত্পাদন, বণ্টন, পরিবহন এবং খুচরা বিক্রি—এই চার ধাপের সমন্বয় বলা যেতে পারে। বর্তমানে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে বড় ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। করোনা মহামারির অবসানে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ সারা বিশ্বে সর্বনাশ ডেকে এনেছে। আগে করোনায় ছিল পরিবহনের সংকট, এখন পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ভোগাচ্ছে বিশ্ববাসীকে। সাপ্লাই চেইন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে যারা জড়িত ছিলেন, করোনা মহামারিতে তাদের অনেকে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, অনেককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, পেশাও পরিবর্তন করেছেন অনেকে। আবার বিদেশি শ্রমিকদের ক্ষেত্রে অনেকে দেশে ফিরে এসেছেন। এক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার পামওয়েল ইন্ডাস্ট্রির কথা বলা যেতে পারে, যেখানে গত এক বছর যাবত্ শ্রমিকসংকটের কারণে উত্পাদন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।

বিশ্ব জুড়ে শ্রমসংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র জ্বালানিসংকট। কৃষিতে ব্যবহূত সার প্রধানত নাইট্রোজেন ও অ্যামোনিয়া থেকে তৈরি হয়, যা পাওয়া যায় প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি ধাপই এতে প্রভাবিত হচ্ছে। করোনায় চাহিদা ও দাম কমে যাওয়ায় ২০২০ সালের মে মাসে ওপেকভুক্ত দেশগুলো দিননপ্রতি ১ কোটি ব্যারেল তেল উত্পাদন কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। করোনা-পরবর্তী সময়ে কলকারখানা খুলতে শুরু করায় জ্বালানি তেলের দ্রুত চাহিদা বাড়ছে। অথচ সুযোগ কাজে লাগাতে ওপেকভুক্ত দেশগুলো চাহিদামতো তেল উত্পাদন বাড়াচ্ছে না। ইকুয়েডর, কাজাখস্তান ও লিবিয়ার মতো দেশগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে তেলের উত্পাদন কমিয়ে দিয়েছে? এমন পরিস্থিতিতে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো লাভবান হলেও ভোক্তা দেশগুলোর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে শস্য উত্পাদন হ্রাস পেয়েছে। আইপিসিসির তথ্যমতে, চলতি বছর শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশেষ কিছু অঞ্চলে খাদ্যদ্রব্যের দাম ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে গেল বছর উত্তর আমেরিকায় গম উত্পাদন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। একই অবস্থা ছিল দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়েতে। দাম বাড়তে ভূমিকা রাখছে এ বিষয়গুলোও। এছাড়া আমদানিতে অতিরিক্ত ট্যাক্স, ব্যবসায়ীদের কারসাজি, আন্তর্জাতিক বাজারে মুদ্রার দাম কমে যাওয়া, বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপের অভাবসহ নানা কারণে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে দ্রব্যমূল্যে বাড়ছে।

জ্বালানি তেল ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে যোগ হয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ। এই পরিস্থিতিতে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। সরকারের কাছে বাজার নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার মূলত চারটি—পণ্যের ওপর শুল্ককর কমানো, খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি বাড়ানো, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং বার্ষিক কী পরিমাণ চাল ও অন্যান্য পণ্য আমদানি করতে হবে, তার সঠিক হিসাব নিরূপণ করে আমদানির ব্যবস্থা করা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব অগ্রগতি দেখালেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশ তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি খাদ্য :গম, সূর্যমুখী ও ভুট্টা যে দুটি দেশ থেকে আমদানি করে, তারা বর্তমানে যুদ্ধে লিপ্ত। ২০২০ সালে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে বাংলাদেশ মোট ১০০ কোটি টন গম আমদানি করে, যা বাংলাদেশের মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ। দেশে ভুট্টার মোট চাহিদার ২০ শতাংশ এবং সূর্যমুখী তেলের চাহিদার ৮০ শতাংশ আসে এ দুই দেশ থেকে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউক্রেনে যুদ্ধ প্রলম্বিত হতে থাকায় বিকল্প উত্স খুঁজতে হবে বাংলাদেশকে। তবে বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় কাজটি যে সহজ হবে না, তা বলা  বাহুল্য। একই সঙ্গে অবৈধ মজুতদারেরা যেন যুদ্ধের অজুহাত দেখিয়ে আমদানি করা খাদ্যশস্যের দাম বাড়াতে না পারে, সে জন্য তত্পর হতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে। মনে রাখতে হবে, যে কারণে পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া, তার অনেকটা দায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণে। তবে এখন আন্তর্জাতিক বাজারে এই দাম কিছুটা কমতে থাকায় আনুপাতিক হারে তা সমন্বয় করতে হবে। এছাড়া জ্বালানি তেল-গ্যাস, বিদুত্ ও পানি সরবরাহে অনিয়ম, অবৈধ মজুত-দুর্নীতি ও অপচয় কমিয়ে সাশ্রয়ী হওয়ার দিকেও মনোযোগ দেওয়া উচিত। যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হলো গতকাল, তার যথাযথ বাস্তবায়নও একান্ত কাম্য।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কো. লি.