দোকানে পাশাপাশি দুই জায়গায় পেঁয়াজ রাখা। একটু বড় আকারের দেশি পেঁয়াজের কেজি ৮০ টাকা। আর আকারে একটু ছোট হলে দাম ৭০ টাকা। গত মাসের শেষের দিকে হঠাৎ করেই দেশি পেঁয়াজের কেজি ৪০-৫০ টাকা থেকে এক লাফে ৮০ থেকে ৯০ টাকায় উঠে যায়। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছিলেন, পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিলে দাম কমে আসবে। কিন্তু এখন পেঁয়াজ আমদানির পরও দাম কি আগের জায়গায় এসেছে? এই প্রশ্ন ভোক্তাদের। বলাবলি হচ্ছিল আমদানির পর গুপ্তস্থানসমূহে পেঁয়াজ মজুতকারীরা বিপদে পড়বে। কিন্তু তারা আদৌ বিচলিত হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন কয়েক দিন আগে চিনির দাম বাড়ানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঈদের আগে চিনির দাম না বাড়লেও ঈদের পর বাড়ানো হবে। কোরবানির ঈদকে উপলক্ষ করে সব ধরনের মসলার দাম বাড়তি। সব মিলিয়ে নাভিশ্বাস উঠেছে স্বল্প আয়ের মানুষের। কাটছাঁট করেও তারা সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে রাখার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছে। যেসব পণ্য আমদানি করতে হয়, সেসব পণ্যের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে বাজারে বিক্রি করতে হয়। কিন্তু ভোক্তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারে দাম বাড়ে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশের বাজারে সেভাবে দাম কমে না। এছাড়া দেশে উৎপাদিত অনেক পণ্যের দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
পেঁয়াজ আমদানিতে লাভ হলো কার :দেশে অক্টোবর, নভেম্বরের দিকে বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকে। তখন পেঁয়াজের দামটা বেড়ে যায়। আবার ডিসেম্বরে নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ ওঠা শুরু হলে দামটা ধীরে ধীরে কমে আসে। এরপর যখন ফেব্রুয়ারি-মার্চে পেঁয়াজের পুরো মৌসুম শুরু হয় তখন প্রতি কেজি পেঁয়াজ ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়। এছাড়া বছরের বাকি সময় ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজির মধ্যে পেঁয়াজ বিক্রি হতে দেখা যায়। কিন্তু চলতি বছর মে মাসের শেষের দিকে হঠাৎ করেই লাগামহীনভাবে পেঁয়াজের দাম বাড়তে থাকে। প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৮০ থেকে ৯০ টাকায় উঠে যায়। কিন্তু এখন পেঁয়াজ আমদানির পরও দাম সেভাবে কমেনি। রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর আমদানিকৃত পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়ার আগে কৃষি মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছিল, পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সীমিত আয়ের ও শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট লাঘবসহ ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দাম সেভাবে কমেনি। সে কারণে প্রশ্ন উঠেছে, পেঁয়াজ আমদানি করে লাভ হলো কার?
বাড়ানোর আগেই বাড়ছে চিনির দাম : বর্তমানে দেশের বাজারে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা। এর মধ্যে গত সোমবার চিনিকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন ঈদুল আজহার আগে চিনির দাম কেজিতে সর্বোচ্চ ২৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, ঈদের আগে চিনির দাম বাড়বে না। ঈদের পর এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে চিনির দাম বাড়ানোর এ প্রস্তাবে ইতিমধ্যে বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বাজারে চিনির দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।
রাজধানীর তুরাগ এলাকার একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের বিক্রেতা জানান, কোম্পানিগুলো বাজারে চিনির সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ফলে বাজারে চিনির দাম আগের চেয়ে বাড়তি। তবে বাণিজ্যমন্ত্রী বাজারে সরকার নির্ধারিত দরে চিনি বিক্রি হচ্ছে কি না, তা মনিটরিং করার জন্য জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বেড়েই চলেছে। যার প্রভাব আমাদের দেশেও পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করার জন্য ট্যারিফ কমিশনকে বলা হয়েছে। তারা জানিয়েছে দেশের চিনির দামের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মূল্যের কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। সেটা আমরা সমন্বয় করব। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, চিনির ওপর যে শুল্কহার নির্ধারণ করা আছে, তা কমানো অথবা ছাড় দেওয়ার বিষয়ে আমরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরকে অনুরোধ করব। এটা করা হলে চিনির দাম কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
মসলার বাজার চড়া :আসন্ন কোরবানির ঈদকে উপলক্ষ করে বাজারে সব ধরনের মসলার দাম বেড়েছে। এক মাসের ব্যবধানে জিরা, এলাচ, লবঙ্গ, আদা, রসুনের দাম কেজিতে ৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গতকাল বাজারে প্রতি কেজি আমদানি করা আদা ৩০০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা ও দেশি আদা ৩৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়। যা এক মাসের ব্যবধানে কেজিতে ৫০ টাকা থেকে ৭০ টাকার বেশি বেড়েছে। এছাড়া, প্রতি কেজি আমদানিকৃত রসুনে ৫০ টাকা বেড়ে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি রসুনের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। গতকাল বাজারে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হয় ২ হাজার ৬০০ টাকা, যা আগে ২ হাজার ২০০ টাকা ছিল। লবঙ্গ বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৮০০ টাকায়, আগে ছিল ১ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতি কেজি জিরা বিক্রি হয় ৯০০ টাকা, যা মাসখানেক আগে ৭৫০ টাকা ছিল। ধনিয়ার গুঁড়ার কেজি বিক্রি হয় ১৯০ টাকা, যা আগে ছিল ১২০ টাকা।
বেড়েছে মাছের দাম : বছরখানেক আগেও দাম কম থাকায় গরিবের মাছ হিসেবে কদর ছিল তেলাপিয়া আর পাঙাশ। কিন্তু সেই মাছও এখন বলতে গেলে নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এক বছর আগেও রাজধানীর বাজারে আকারভেদে প্রতি কেজি তেলাপিয়া ১৪০ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সেই তেলাপিয়ার কেজি এখন ২৩০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। আর পাঙাশের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকা থেকে ২২০ টাকা। অন্যান্য মাছের মধ্যে চাষের কই ২২০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা, শিং ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, ট্যাংরা ৫০০ থেকে ৭৫০ টাকা, পাবদা ৩৮০ থেকে ৫৫০ টাকা, রুই ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, কাতলা ৩২০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা, চিংড়ি ৬০০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, বোয়াল ৬০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এসব মাছ এক বছরের ব্যবধানে কেজিতে ৩০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
মাছের পাশাপাশি মুরগি, গরু ও খাসির মাংসের দামও বেড়েছে। গতকাল রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকা, খাসির মাংস ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকা থেকে ২০০ টাকা ও দেশি মুরগি ৭০০ টাকা থেকে ৭৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে, যা গত বছর ছিল যথাক্রমে ৬৫০ টাকা থেকে ৬৮০ টাকা, ৮৫০ থেকে ৯৫০ টাকা, ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা ও ৫২০ থেকে ৫৫০ টাকা। সরকারের বিপনন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদনেই এক বছরের ব্যবধানে দাম বাড়ার এ তথ্য জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন ইত্তেফাককে বলেছেন, পশুখাদ্যের দাম অনেক বেড়েছে। বিদ্যুৎ বিলসহ নানা খাতেও বাড়তি খরচ যোগ হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে মাংসের দামের ওপর।