সরকারের বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ

কম মূল্যে বই ছাপতে রাজি কয়েক জন প্রেস মালিক

বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের লক্ষ্যে আগামী শিক্ষাবর্ষে ৩৫ কোটি বই ছাপবে সরকার। এ জন্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তুতি রয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি)। সে লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বান শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অধীনস্থ সরকারি এই সংস্থাটি। কিন্তু যে দর জমা পড়েছে তা দেখে হতবাক এনসিটিবি কর্মকর্তারা। প্রাথমিকের ১০ কোটির বেশি বই ছাপতে সর্বনিম্ন যে দর পড়েছে তা প্রাক্কালিত দরের তুলনায় ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ কম।

মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপার ক্ষেত্রেও একই হারে কম দর দেওয়া হয়েছে। এভাবে ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ কম দরে বই ছাপলে সরকারের অন্তত ৩০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কী লোকসান দিয়ে বই ছাপবে প্রেস মালিকরা? কিন্তু নেপথ্যের গল্প ভিন্ন। খোদ এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, গুটি কয়েক প্রেস মালিক সিন্ডিকেট করছে। বইয়ের মান ঠিক রেখে সরকার ভালো দরে উন্নতমানের বই ছাপতে চায়। কিন্তু কিছু প্রেস মালিক সিন্ডিকেট করে কম দরে দরপত্র জমা দিয়েছেন। তাদের কৌশল হলো, বই ছাপার কাজ পাওয়ার পর তারা নিম্নমানের কাগজ ও কালি ব্যবহার করে বই ছাপবে, আর অর্থের বিনিময়ে  বই তদারকি বা মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করবে। ফলে কম দর দিয়েও ভালো লাভ করবে তারা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই দরে দরপত্রের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ভালো মানের বই কোনোভাবেই ছাপা ও সরবরাহ করা সম্ভব নয়।

423168_111

দরপত্রে ৮০ জিএসএমের কাগজে বই মুদ্রণের কথা বলা হয়েছে। কয়েক জন প্রেস মালিক যে দরে বইয়ের কাজ দিতে চাইছে তাতে ৭০ জিএসএমের কাগজেও বই দেওয়া সম্ভব নয় বলে সংশ্লিষ্টদের মত।

 প্রেস মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল আহমেদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, এই দর দিয়ে কোনোভাবেই ভালো মানের বই ছাপানো সম্ভব নয়। নিম্নমানের কাগজ দিয়ে বই ছেপে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এতে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে ।

তিনি বলেন, চলতি শিক্ষাবর্ষে ৮৫ জিএসএম এর কাগজে বই ছাপার নির্দেশনা ছিল কিন্তু এবার তা কমিয়ে ৮০ জিএসএম করা হয়েছে। আমরা চাই, সরকার প্রেস মালিকদের কাজের সক্ষমতা নির্ধারণ করুক। তারপর তাদের কাজ দিক। কারণ অনেক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা কম। কিন্তু তাদের বেশি কাজ দেওয়া হয়েছে। তারা নিম্নমানের কাগজে বই ছাপে।

আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণি এবং মাধ্যমিকের অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম শুরু হবে। এই চার শ্রেণির বই ছাপাতে এখনো দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। এর বাইরে অনেকগুলো বই ছাপানোর জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার মাধ্যমিকের বইয়ের প্রতি ফরমার দর নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ টাকা ১০ পয়সা। কিন্তু কয়েক জন প্রেস মালিক ২ টাকা থেকে আড়াই টাকা পর্যন্ত সর্বনিম্ন দর দিয়েছেন। বর্তমানে ভালো মানের নিউজপ্রিন্টেরই দাম টনে ৭৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা। এর বাইরে মুদ্রণসামগ্রী, বাইন্ডিং, বইয়ের কভার, পরিবহনসহ নানা খরচ রয়েছে। ফলে কম দরে কাজ দেওয়া হলে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপা হবে।

main_1667272087

২০২৩ শিক্ষাবর্ষে কয়েকটি মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের কাগজে বই সরবরাহ করে। এসব বই শিক্ষাবর্ষ শুরুর দুই তিন মাসের মধ্যেই ছিঁড়ে যায়। কালি উঠে যায়। পাঠের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দরপত্রের শর্ত পালন করলে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়ার বিধান রয়েছে।

বই ছাপার আগে কাগজ ও বইয়ের মান তদারকি এবং সরবরাহের পর বইয়ের মান তদারককারীরা মুদ্রাকর ও এনসিটিবির কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে নিম্নমানের কাগজকেও সঠিক মানের বলে প্রতিবেদন দেয়। ফলে নিম্নমানের নিউজপ্রিন্টে বই ছাপলেও মুদ্রাকরদের কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না।

নজরুল ইসলাম নামে এক অভিভাবক বলেন, শিশু শিক্ষার্থীদের হাতে যেন দ্রুত পাঠ্যবই নষ্ট না হয় এবং বইয়ের প্রতি তাদের আকৃষ্ট করতে অফসেট পেপারে চার রংয়ের বই দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। সেখানে ৮২ শতাংশ উজ্জ্বলতা থাকার কথা থাকলেও নিউজপ্রিন্টের কালো কাগজে প্রাথমিকের অধিকাংশ বই পাওয়া গেছে। এবছর যেসব বই শিশুদের বিতরণ করা হয়েছে তা দিয়ে বছর পার করা যাবে না। আগামী শিক্ষাবর্ষেও যদি নিম্নমানের কাগজে বই দেওয়া হয় তাহলে আমরা কোথায় গিয়ে বিচার চাইব।

অন্যদিকে গতবছরের বই ছাপার ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম হয়েছে এবং নিম্নমানের কাগজে বই ছাপা হয়েছে এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছে মুদ্রণ শিল্প সমিতি। সমিতির নেতারা বলেন, ২০২৩ শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সহযোগিতায় সক্ষমতার অধিক কার্যাদেশ প্রাপ্ত দুইটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে নিম্নমানের কাগজে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করে। এসব পাঠ্যপুস্তক তিন/চার মাসের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের পাঠ্যের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এ প্রতিষ্ঠানসমূহ এপ্রিল/মে মাসেও বই সরবরাহ করে কিন্তু পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এ বিলম্ব নথিভুক্ত করেনি। কারণ সফটওয়্যার পরিবর্তনের মাধ্যমে বোর্ড কর্মকর্তার সহযোগিতায় এই অনিয়মটি সংঘটিত হয়েছে।

মুদ্রণ শিল্প সমিতির সভাপতি জহিরুল ইসলাম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, বই নিয়ে শিশু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খেলা করা হচ্ছে। এটা কোনোভাবেই আমরা মেনে নেব না। এসব অনিয়ম নিয়ে আমরা বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। আশা করছি, বিচার পাব।