সত্তরোর্ধ্ব সখিনা বেওয়া বাল্যকালে বাঁশের সাকো পেরিয়ে বহুবার মামার বাড়ি গেছেন। বৈরাণ নদের স্টিলের ব্রিজ পেরিয়ে এখনো শ্বশুরবাড়ি আসা-যাওয়া করেন। যমুনা নদীর বঙ্গবন্ধু সেতু পেরিয়ে বার কয়েক সিরাজগঞ্জে মেয়ের বাড়ি গেছেন। তিন মাস আগে পদ্মা সেতু পার হয়ে মাদারীপুর শহরে নাতজামাই বাড়িও গেছেন। কিন্তু দীর্ঘ জীবনে কচুরিপানার সেতু কখনো দেখেননি। তাই শুক্রবার টাঙ্গাইলের গোপালপুরের হাদিরা ইউনিয়নের চাতুটিয়া গ্রাম থেকে এক কিলোমিটার পায়ে হেঁটে ঝাওয়াইল ইউনিয়নের পাকুটিয়া গ্রামের ঝিনাই নদীতে গজিয়ে ওঠা কচুরিপানার সেতু দেখতে আসেন।
সখিনা বেওয়া দৈনিক ইত্তেফাককে জানান, কচুরিপানার সাঁকোতে নদী পারাপারে ছিল জীবনের রোমাঞ্চকর অনুভূতি।
শুধু সখিনা বেওয়া নয়, আশপাশের ১০ গ্রামের বহু মানুষ প্রতিদিনই এ কচুরিপানার জগত্ দেখতে আসছেন। মনের খুশিতে কচুরিপানার ওপর দিয়ে নদী পার হচ্ছেন। কেউ কেউ দলবেঁধে সেলফি তুলছেন, কচুরিপানার মহাত্ম নিয়ে লাইভ করছেন। নদীর উজানে প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ কচুরিপানার শক্ত স্তর এখন বিশাল সবুজ মাঠ। এ সমান্তরাল মাঠে ছেলেরা দলবেঁধে ফুটবল আর গোল্লাছুট খেলছে।
পাকুটিয়া পশ্চিমপাড়া গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য শরীফ হোসেন জানান, ২০০৪ সালে নদীর এ স্থানে এলজিইডি একটি সেতু নির্মাণ করে। সাত বছর আগে সেটির পাঁচ গার্ডারের মাঝখানের দুটো নদীতে ধসে পড়ে। ফলে দুই পাড়ের ১০ গ্রামের মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। নদীর পশ্চিমপাড়ে একটি সরকারি প্রাইমারি বিদ্যালয়। সেটি আবার এলাকার ভোট কেন্দ্র। আর পূর্বপাড়ে একটি উচ্চবিদ্যালয়, একটি মন্দির ও বড় বাজার অবস্থিত। তাই ঝিনাই নদীর এ সেতুটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘ দিনেও ভাঙা সেতু মেরামত বা সেখানে নতুন সেতু নির্মাণ না করায় সংশ্লিষ্ট সবাই দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
চলতি বর্ষায় যমুনার এ শাখা নদীতে ঢলের পানি উপচে পড়ায় উজানের সরিষাবাড়ী এলাকার কচুরিপানা স্রোতে ভেসে সেতুতে আটকে পড়ে। স্রোতের ধাক্কায় তা কয়েক ফুট উঁচু হয়ে শক্ত স্তর তৈরি করে।
ভেঙ্গুলা বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি বছর বর্ষাকালে ঝিনাই নদীতে পানি পড়লে যন্ত্রচালিত নৌকায় পণ্য আনা ও নেওয়া করা হয়। কিন্তু পাকুটিয়া ব্রিজে কচুরিপানার চর পড়ায় এবার নৌপথে যাতায়াত সম্ভব হচ্ছে না। বিশাল স্তরের দরুণ নদীর স্বাভাবিক স্রোত ব্যাহত হওয়ায় উজানে নদীভাঙনের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঝাওয়াইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান জানান, সেতুর ধসে পড়া দুটি গার্ডারের স্থানে স্টিলের পাতাটান জুড়ে দিয়ে অচল সেতু সচল করার কাজ শুরু করার কথা এলজিইডির। কিন্তু শুক্রবার ভোরে সেতুর মাঝখানের আরো একটি গার্ডার ধসে পড়ায় স্টিলের পাটাতনের কাজ করা হয়তো কঠিন হয়ে পড়বে।
গোপালপুর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান জানান, ওই খানে নতুন সেতু করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ জন্য মানুষের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে স্টিল পাটাতান জুড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। এখন আরেকটি পাটাতন ধসে পড়ায় আদৌ কাজটি করা সম্ভব হবে কিনা, তা সরেজমিন তদন্তের পর বলা যাবে।