কোরবানির ঈদ: লাল মাংস ও চর্বিযুক্ত খাবার

কয়দিন পরই কোরবানির ঈদ। পশু জবাই-ই হচ্ছে এ ঈদের প্রধান আয়োজন। সামর্থ্যবান সব মুসলিম পরিবারই এ কোরবানির ঈদে গরু-ছাগল-মহিষ ইত্যাদি পশু জবাই করে। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় এ ঈদের সময় লাল মাংস খাওয়া হয় অনেক বেশি। তবে সুস্থ থাকতে হলে লাল মাংস ও চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণে অধিক সচেতন ও সর্তক থাকতে হবে সবাইকে।

জ্বালানি ব্যতিরেকে যানবাহন চলে না। আমাদের চলার এবং বেঁচে থাকার মূল জ্বালানি হলো শর্করা ও চর্বি। সাধারণত শর্করা থেকেই আমরা শক্তি পাই। মস্তিষ্কসহ আরো কিছু কোষ শুধু শর্করা থেকে শক্তি পায়। আবার চর্বি পুড়তে লাগে শর্করার স্ফুলিঙ্গ। অর্থাত্ শর্করা ছাড়া চলবেই না। শর্করার মূল উৎস হলো ভাত, রুটি ও আলু। এগুলো বেশি খেলে বেশিটুকু চর্বি হিসাবে লিভার এবং শরীরের অন্যান্য জায়গায় জমা হয়ে থাকে। উপবাস করলে লিভারের সঞ্চিত শর্করা ভেঙে যায়। সঞ্চিত শর্করা নিঃশেষ হলে লিভার নিজেই শর্করা উৎপাদনে নেমে পড়ে—আমিষ ও চর্বি থেকে ধার করা কাঁচামাল দিয়ে। তবে কখনো কখনো মস্তিষ্ককে বাঁচিয়ে রাখে চর্বির বিপাকে উৎপাদিত উপজাত কিটোন বডি। এই পর্যায়ে সঞ্চিত চর্বি ভাঙে এবং শক্তি উৎপাদন শুরু করে। এজন্য বলব, মাঝেমধ্যে উপবাস থাকা স্বাস্থ্যকর। উলটোভাবে বলব, শর্করা ও চর্বির পরিমাণের বেশি খেলে শরীরে মেদ হিসেবে জমা হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে যকৃত ও রক্তনালিকা।

লাল মাংস বিভিন্ন কারণে খারাপ খাবারের তালিকায় চলে এসেছে। গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষের মাংস হলো লাল মাংস। এগুলো স্যাচুরেটেড ফ্যাট সমৃদ্ধ, যা স্বাস্থ্যপ্রদ নয়। যকৃত হার্ট, মস্তিষ্ক ও রক্তনালিকা ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রধান কারণ এই লাল মাংস। অতিরিক্ত চর্বি গ্রহণ নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ। ট্রান্স-ফ্যাট হার্টের জন্য সবচেয়ে খারাপ টক্সিন। উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত হয়ে ফ্যাটগুলো ট্রান্স-ফ্যাটে রূপান্তরিত হয়। প্যাকেটজাত খাবার এবং প্রাক-রান্না করা খাবার ট্রান্স-ফ্যাট সমৃদ্ধ। খাবারের প্রসেসিং পদ্ধতি এবং প্যাকেজিং খাদ্যকে নষ্ট বা পচে যাওয়া থেকে রক্ষা করে এবং জীবাণু সংক্রমণে বাধা দেয়। এই খাবারগুলো আমাদের অন্ত্রে অন্যভাবে কাজ করে। এগুলো অন্ত্রের স্বাস্থ্যকর উপকারী জীবাণুগুলোকে হত্যা করে বা বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। ফলে অন্ত্র খারাপ জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয় এবং ক্যানসার হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি করে। ট্রান্স-ফ্যাট হলো অসম্পৃক্ত চর্বি, যা বারবার তাপের ফলে হাইড্রোজেন যুক্ত হয়ে সলিড ও মন্দ চর্বিসমৃদ্ধ হয়। সলিড চর্বি (বাটার, লার্ড—যা প্রাণিজ উৎস) খুব খারাপ। তরল উদ্ভিজ তেল ভালো। রেপসিড অয়েল, অলিভ অয়েল, বাদাম তেল, কুসুম ফুল তেল, তিল তেল, ভুট্টা তেল, সূর্যমুখী তেল এবং সয়াবিন তেল ভালো। কম চর্বিযুক্ত বা চর্বিহীন দুধ পনির ও দই স্বাস্থ্যকর। মাছের তেল ভালো এবং মাংসের তেল খারাপ। দুধ ও নারিকেল থেকে প্রাপ্ত সম্পৃক্ত চর্বির ভালো গুণাগুণ নিয়ে গবেষণা চলছে। অসম্পৃক্ত চর্বি ভালো। কিন্তু পরিশোধনের সময় উচ্চতাপে রান্না এবং বারবার তেলকে ফ্রাই করার সময় অসম্পৃক্ত চর্বি হাইড্রোজেনেশনের মাধ্যমে সূক্ষ্ম রক্তনালির জন্য ক্ষতিকর ক্যানসার উৎপাদনকারী ট্রান্স-ফ্যাটি অ্যাসিড, ফ্রি রেডিকেল, মেলোনডি এলডি হাইড তৈরি হয়। আবার উচ্চতাপে উপকারী অ্যান্টি অক্সিডেন্ট (টোকোফেরল, অরিজেনল, কেরোটিন, টোকোট্রিনলস), পলিস্টেরলস এবং মাইক্রোনিওট্রিয়েন্স নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাত্ পরিশোধিত পলি অসম্পৃক্ত সয়াবিন, সানফ্লাওয়ার তেমন ভালো নয়। মনো অসম্পৃক্ত সমৃদ্ধ তেল হলো ভালো। অলিভ, রেপসিড এবং সরিষার তেল, পলিফেনোলিক সমৃদ্ধ। অলিভ অয়েল খুব ভালো হলেও স্বাস্থ্যকর আলফা লিনোলেনিক অ্যাসিড কম থাকে। অন্যদিকে অলিভ ওয়েলের স্মোক পয়েন্ট কম, ফলে উচ্চতাপে গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়।

স্বাস্থ্যকর ভূমধ্যসাগরীয় খাবারের মূল উপাদান অলিভ ওয়েল। কিন্তু তারা আমাদের মতো উচ্চতাপে রান্না করে না এবং অলিভ ওয়েলটি থাকে অপরিশোধিত এক্সটা ভার্জিন। আবার অলিভ অয়েল অনেক দামি। রেপসিড অয়েল সবচেয়ে ভালো, যা স্কেন্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে পাওয়া যায়। জাপানিজ খাবারে অপরিশোধিত সয়া থাকে এবং তারা উচ্চতাপে রান্না করে না। অপরিশোধিত সরিষার তেল মনোপলি অসম্পৃক্ত (বিশেষত ভালো আলফা লিনোলেনিক অ্যাসিড বেশি) ফ্যাটি অ্যাসিড-সমৃদ্ধ এবং সম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড কম থাকে। লিনোলেনিক অ্যাসিড এবং আলফা লিনোলেনিক অ্যাসিড বেশি থাকে সরিষার তেলে, যা কার্ডিওপ্রোটেক্টিভ। সরিষার তেল উচ্চতাপ অনেকটা সহ্য করতে পারে, তবে তা হতে হবে ঘানিতে ঠান্ডা চাপে তৈরি অপরিশেধিত। কোকোনাট অয়েলে মিডিয়াম চেইন সমৃদ্ধ সম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড বেশি থাকে। শর্ট চেইন ফ্যাটি অ্যাসিডও থাকে। কোকোনাট অয়েল স্বাস্থ্যকর এবং ডিপ ফ্রাইয়ের জন্য ভালো। ঘিতে লং চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড বেশি থাকলেও মনো আনসেসোরেটেড শর্ট ও মিডিয়াম চেইন ফ্যাটি অ্যাসিডও থাকে। ক্ষতিকর ট্রান্সফ্যাট ঘিতে থাকে মাত্র শতকরা দুই ভাগ, যেখানে বনস্পতিতে থাকে ৫৩ ভাগ। ঘি ও কোকোনাট অয়েল উচ্চতাপে স্ট্যাবল এবং ডিপ ফ্রাইয়ের জন্য ভালো।

আমিষ ও চর্বির মূল উৎস হলো মাংস, ডিম ও মাছ। শক্ত মাংসপেশির জন্য চাই এই আমিষ। প্রাকৃতিক মুক্ত পরিবেশে বড় হওয়া অর্গানিক খাবার খাওয়া গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, ভেড়ার মাংসে কনজুগেটেড লিনডিয়াক অ্যাসিড এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বেশি থাকে, যা মানুষের হার্টের ও ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। মাংস আমাদের শরীরের বৃদ্ধি, ক্ষয়সাধন, রক্ষণাবেক্ষণ, ক্ষয়পূরণ ও রোগপ্রতিরোধের জন্য অত্যাবশ্যক—সেটা যদি হয় স্বাস্থ্যকর প্রাকৃতিক মুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা প্রাণিজাত মাংস।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, গ্যাস্ট্রো অ্যান্টারলজি বিভাগ, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা