মক্কা শরিফে এ বছরের হজ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে গেছে। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে পবিত্র হজ একটি। আভিধানিক অর্থে হজের অর্থ ইচ্ছা বা অভিপ্রায় পোষণ করা, সংকল্প করা, সুদৃঢ় প্রত্যয় বা সিদ্ধান্ত নেওয়া, কোনো সম্মানিত স্থান দর্শনের সংকল্প করা। ‘আল-কামুসুল ফিকহ’ গ্রন্থের ভাষায়, আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে, বিশেষ অবস্থায়, নির্দিষ্ট স্থানে, নির্ধারিত নিয়মে, নির্দিষ্ট কতগুলো অনুষ্ঠান পালন করাকে হজ বলে। নির্দিষ্ট সময় বলতে ৮ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ পর্যন্ত সময়কে বোঝায়। বিশেষ অবস্থা বলতে ইহরামের অবস্থাকে বোঝায়। নির্দিষ্ট স্থান বলতে কাবা শরিফ (সাফা-মারওয়াসহ) এবং তার আশপাশের মিনা, মুজদালিফা প্রভৃতি স্থানকে বোঝায়। নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান বলতে ইহরাম, তাওয়াফ, সায়ি, ওকুফ (অবস্থায়) ও কোরবানি হজের নির্ধারিত অনুষ্ঠানগুলোকে বোঝায়।
হজের রয়েছে সুপ্রাচীন ইতিহাস ও দীর্ঘ পটভূমি এবং এর প্রতিটি কাজ ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত ও তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহ পাকের নির্দেশে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে পাঠানোর পর হজরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া (আ.) পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে তারা একে অপরকে খুঁজতে থাকেন। অবশেষে আল্লাহর রহমতে তারা সুদীর্ঘকাল পর আরাফাতের ময়দানে পরস্পর মিলিত হন। তারই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আদম সন্তানগণ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতি বছর আরাফাতের মহামিলন প্রান্তরে সমবেত হয়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করেন। তারা তাদের হৃদয়-মন দিয়ে আল্লাহকে উপলব্ধির আপ্রাণ চেষ্টা করেন। এভাবে সাফা-মারওয়ার মধ্যে সায়ি, মিনায় শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ এবং কোরবানির প্রেক্ষাপট, যা হজরত ইবরাহিম (আ.) ও বিবি হাজেরা এবং তাদের পুণ্যবান সন্তান হজরত ইসমাইল (আ.)-এর দ্বারা রচিত হয়েছে আজ থেকে প্রায় ৪ হাজার বছর আগে।
হজরত আদম (আ.) প্রথম বায়তুল্লাহ শরিফে হজ আদায় করেন। এরপর হজরত নুহ (আ.)সহ অন্য নবি-রসুল সবাই বায়তুল্লাহ জিয়ারত ও তাওয়াফ করেছেন। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, বায়তুল্লাহ শরিফ পুনর্নির্মাণের কাজ সমাধার পর হজরত জিবরাইল (আ.) হজরত ইবরাহিম (আ.)কে এই পবিত্র গৃহ তাওয়াফ ও হজ করার জন্য বললেন। এই নির্দেশ পেয়ে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) উভয়েই তাওয়াফসহ হজের যাবতীয় কর্মকাণ্ড সমাধা করলেন। এরপর আল্লাহ তাআলা হুকুম করলেন, হে ইবরাহিম, তুমি সমগ্র পৃথিবীর মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা ছড়িয়ে দাও। এই মর্মে কোরআন মজিদে সুরা হজের ২৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, ‘এবং মানুষের নিকট হজের ঘোষণা করে দাও; তারা তোমার কাছে আসবে পদব্রজে এবং সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উষ্ট্রের পিঠে, তারা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।’
জাহিলিয়াতের যুগেও লোকেরা বায়তুল্লাহ শরিফ তাওয়াফ ও জিয়ারত করত। কিন্তু তারা তা করত নিজেদের মনগড়া পন্থায়। নিজেদের ভ্রান্ত চিন্তাধারার আলোকে জাহিলি বহু কাজ তারা হজের অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিল। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, হজের মৌসুমে কুরাইশগণ অন্য হাজিদের ন্যায় আরাফায় না গিয়ে মুজদালিফায় অবস্থান করতেন। তারা বলতেন, আমরা স্থানীয় বাসিন্দা। আমাদের একটা বিশেষ স্বাতন্ত্র্য ও আভিজাত্য আছে। তাই অন্যদের মতো আমরা সেখানে যেতে পারি না। বস্তুত, কালের বিবর্তনে হজ তখন তার আপন পবিত্রতা ও ভাবগাম্ভীর্যতা হারিয়ে খেল-তামাশা ও অশ্লীল চিত্তবিনোদনের অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। তখন তারা সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় কাবাগৃহ তাওয়াফ করত। ইসলাম জাহেলি যুগের এসব কুসংস্কার চিরতরে বন্ধ করার লক্ষ্যে নতুনভাবে হজের ফরজিয়াতের বিধান প্রবর্তন করে। এই মর্মে আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআন মজিদের সুরা আল ইমরানের ৯৭ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন, মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হজ করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য।
হজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। প্রত্যেক সুস্থ, প্রাপ্তবয়স্ক, বুদ্ধিমান ও সামর্থ্যবান মুসলিম নর-নারীর ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। এরপর যত বার হজ পালন করবে, তা নফল হিসেবে গণ্য হবে। নফল হজেও অনেক সওয়াব রয়েছে। হজ সম্পর্কে পবিত্র কোরআন মাজিদের সুরা আল ইমরানের ৯৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক ইরশাদ ফরমান, ‘আল্লাহর উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহ শরিফের হজ পালন করা মানুষের ওপর অবশ্য কর্তব্য; যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে।’
কাবা আল্লাহর ঘর। পৃথিবীর প্রাচীনতম ইবাদতগৃহ। এটিই বিশ্ব মুসলিমদের কিবলাহ ও মিলনকেন্দ্র। সুতরাং হজ হচ্ছে বিশ্ব মুসলিমের মহাসম্মেলন। বিশ্ব মুসলিম যে এক অখণ্ড উম্মত, হজ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। গায়ের রং, মুখের ভাষা, আর জীবন পদ্ধতিতে যত পার্থক্যই থাকুক না কেন, এই সম্মেলনে তারা একাকার হয়ে যায়, তাদের সব পার্থক্য দূর হয়ে যায়। সবার পরনে ইহরামের সাদা কাপড়। সবার ধর্ম এক, উদ্দেশ্য এক, অন্তরে এক আল্লাহর ধ্যান, সবাই আল্লাহর বান্দা। সবাই ভাই ভাই। এ সবই মুসলিমদের বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের এক অপূর্ব শিহরণ জাগায়। তাদের মধ্যে ভালোবাসা গড়ে ওঠে। সবার কণ্ঠে একই আওয়াজ ধ্বনিত হয়, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’। ‘হাজির হে আল্লাহ, আমরা তোমার দরবারে হাজির।’ এজন্য রসুলে পাক (স.) বলেছেন, ‘পানি যেমন ময়লা ধুয়ে পরিষ্কার করে দেয়, হজও তেমনি গুনাহগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করে দেয়’ (সহিহ বুখারি)।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, শেরপুর