সরকারি দলের নাম ভাঙাইয়া, দলের তকমা গায়ে মাখিয়া একশ্রেণির ধড়িবাজ লোক সকল কিছু গ্রাস করিয়া লইতেছে, যাহার দায় গিয়া পড়িতেছে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের উপর। ইহা অতীব দুঃখের বিষয়। তাহারা ছোটখাটো নির্বাচনেও কালো হাত প্রসারিত করিয়া চলিয়াছে, ব্যবহার করিতেছে প্রশাসনের একশ্রেণির অর্থসর্বস্ব কর্মকর্তাকে। জাতীয় পার্টি নেতা জি এম কাদের এই ধারা লক্ষ করিয়াই আক্ষেপ করিয়া বলিয়াছেন, বর্তমান কাঠামোতে এই ধরনের কিছু লোককে বাছাই করা হইয়াছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইলেকশন কমিশন, কর্মকমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সকল তাহারা নিয়ন্ত্রণে লইয়াছে’। আক্ষরিক অর্থেই ইহাদের হাত এতটাই প্রসারিত যে তাহারা দেশের স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানগুলিতেও টাকার জোরে নিজেদের অপকর্মকে জায়েজ করিয়া লইবার প্রয়াস পাইতেছে। তাহাদের অপতত্পরতা এবং কায়কারবার দেখিলে কেহ ঠাহর করিতে পারেন যে দেশে কোনো প্রশাসন নাই! ইহারাই যেন প্রশাসনের হর্তাকর্তা! দেশে পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের প্রয়োজন রহিয়াছে নিশ্চয়ই। তাহারা অপরিহার্য; কিন্তু তাহারা কতটা সঠিকভাবে কাজ করিতে পারিতেছে অথবা করিতেছে তাহা এই সকল ‘অন্ধকারের হাত’ প্রশ্নবিদ্ধ করিয়া ফেলিতেছে।
একটি গণতান্ত্রিক দেশে জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস হইবার কথা। রাজনৈতিক দল থাকিবে, প্রতিযোগিতা থাকিবে উহা লইয়া কাহারো কোনো দ্বিমত নাই। সেই হিসাবে রাজনীতির সহিত সম্পৃক্তদের জনগণের দ্বারস্থ হইবার কথা; কিন্তু ইহারা জনগণকে উপেক্ষা করিয়া ‘মেকানিজম’-এর মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকিতে চাহিতেছে। নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করিবার জন্য ইহারা প্রশাসনের বিভিন্ন মহলকে ক্রয় করিয়া স্থানীয় পর্যায়ে যাহা খুশি কার্যসাধন করিয়া লইতে অপতত্পরতা চালাইতেছে। কথা হইল, ইহারা যদি সত্যিকার ক্ষমতাসীন দলের লোক হইত, তাহা হইলেও একটি কথা ছিল; কিন্তু ইহারা পরিষ্কার অনুপ্রবেশকারী। ইহারা সমাজে ও বিভিন্ন স্থানীয় এলাকায় অপরিচিত নহে। পূর্বে ইহাদের ভূমিকা কী ছিল, ইহাদের পিতৃপুরুষ কাহারা তাহা নূতন করিয়া পরিচয় করাইয়া দেওয়ার কিছু নাই; কিন্তু তাহাদের আস্ফাালনেই আজ স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া ব্যাহত হইতেছে। তাহারা সকল কিছু এমনই বিশৃঙ্খল করিয়া তুলিতেছে যাহা কোনোক্রমেই ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে শুভকর নহে। দেশের জাতীয় নির্বাচন অতি নিকটে। সুতরাং দলের স্বার্থেই ইহাদের দমন করা এখন আশু কর্তব্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে। প্রশাসন তথা সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও রাষ্ট্রের কোন কোন বিভাগে তাহারা হস্তক্ষেপ করিবার ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করিতেছে তাহা জানা এবং ব্যবস্থা লওয়া সরকারি দলের এখন বিশেষ দায় হইয়া পড়িয়াছে। এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ না থাকায় দল ও প্রশাসন উভয় ক্ষেত্রেই অনুপ্রবেশকারীরা শক্তিশালী অবস্থান হইতে পরাক্রমশালীতে পরিণত হইতেছে। যেই কারণে প্রশাসন ও দলের অভ্যন্তরে নিবেদিত কর্মীরা হাল ছাড়িয়া দিয়াছে। মনে রাখিতে হইবে, অনভিজ্ঞ, বিদ্যাশিক্ষাহীন অথচ ক্ষমতা ও অর্থলিপ্সু কিছু লোক রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করিলে এবং রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রশাসনে প্রবেশ করিয়া অর্থ দ্বারা সকল কিছু নিয়ন্ত্রণ করিলে সকল প্রকারের ভারসাম্য নষ্ট হইতে বাধ্য। ঠিক ‘বানরের হস্তে লাঠি’র যাহা হয়। দুঃখজনকভাবে দেশের জেলা উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যন্ত একই চিত্র পরিলক্ষিত হইতেছে। আমরা পূর্বেও বলিয়াছি, বারংবার সতর্ক করিয়াছি, এখনো আবার বলিতেছি, ইহারা দলের লোক নহে! ইহারা তলে তলে দলের সহিত সাংঘর্ষিক মতাদর্শেরই ধারক-বাহক। ইহারা ঠিক পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখিলে কাটিয়া পড়িবে। সুতরাং সময় এখনো ফুরাইয়া যায় নাই। ইহাদের লাগাম টানিয়া ধরুন! ইহাদের হাত রাষ্ট্রের গভীর স্থলে যাহাতে প্রবেশ করিতে না পারে সেই দিকে সজাগ থাকা দল ও রাষ্ট্রের জন্য ভীষণ প্রয়োজন হইয়া গিয়াছে!