বাজেট সংকটে কোরবানি দিতে অনেকেরই হিমশিম

অনেক ক্ষণ ধরেই কোরবানির হাটের এ-ধার থেকে ও-ধারে ঘুরছিলেন আব্দুল্লাহ আল সউদ জুম্মান। যে গরু পছন্দ করছেন ব্যাপারিরা তার দাম এমন হাঁকছেন, যা তার নাগালের অনেক বাইরে। জুম্মান বললেন, দাম এতটাই বেশি যে বাজেটে কুলাচ্ছে না। গত বছরের তুলনায় এবার গরুর দাম ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি।

হাজারীবাগের লেদার টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের চার পাশ জুড়ে অসংখ্য গরু। সারিবদ্ধভাবে সাজানো। কিন্তু হাটে গরুর দাম অত্যধিক বেশি। হাটেই কথা হলো নিজাম উদ্দিনের সঙ্গে। চাকরি করেন ট্যানারিতে। বললেন, এবার কোরবানি দিচ্ছি না। বাজেটে কুলাচ্ছে না। আগে দুই-তিন জন মিলে গরুর ভাগা দিতাম। এখন তার চেয়ে বেশি টাকা দিয়েও পছন্দের গরু পাচ্ছি না।

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সাধারণ ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল এবার অনেকেরই কোরবানি দেওয়া হচ্ছে না। সবকিছুর খরচ বেড়ে যাওয়ায় যেখানে মাস চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে মানুষের, সেখানে কোরবানি দেওয়ার চাপ নিতে পারছে না পরিবারগুলো। গেল বছরও যারা একা কোরবানি দিয়েছেন এ বছর তাদের অধিকাংশই ভাগে কোরবানি দিচ্ছেন। অনেকে সেটাও দিতে পারছেন না।

খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী মোশাররফ হোসেন এ বছর কোরবানি দেবেন না। কারণ হিসেবে জানালেন, তিনি মাসে ৬৫ হাজার টাকা বেতন পান। প্রতি বছরই বোনাসের টাকায় দুই ভাই মিলে কোরবানি দিতেন। গেল তিন বছর ধরে সেই বোনাসের টাকায় দুই ভাগে একটা গরু মিলছে না। এ বছর দাম বেড়েছে আরো বেশি। সব দেখে বুঝে কোরবানি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের (এনজিও) কর্মকর্তা তানজিবুল ইসলাম বললেন, আয় থেকে কোরবানির জন্য টাকা আলাদা করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু কোরবানি না দিলে সামাজিক চাপ তৈরি হয়। বাচ্চারা মন খারাপ করে। সে চাপের কারণে বাচ্চাদের কথা ভেবে দিতে হয়। কিন্তু এ বছর সেটাও পারছি না।

ক্রেতারা বলছেন, ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ হওয়ার পর থেকেই দেশের বাজারে হু হু করে মাংসের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এর ফলে দেশি গরুর চাহিদা বেড়েছে, গড়ে উঠেছে অসংখ্য খামার। এর মাধ্যমে দেশের চাহিদা মিটলেও দাম বৃদ্ধির কারণে তার মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদেরই। ফলে ভারত থেকে গরু আমদানির পক্ষে সাধারণ ক্রেতারা। তবে, খামারিরা ভারতের গরু আনার বিরুদ্ধে। এতে তাদের ব্যবসায় ধস নামবে বলে আশঙ্কা তাদের।

গাবতলীর হাটে গরু নিয়ে আসা মানিকগঞ্জের খামারি মুজাহিদ বললেন, গরুর দাম বেশি হওয়ার কারণ গো-খাদ্যের দাম বেশি। ঘাসের উত্পাদন খরচ বেড়েছে, শ্রমিকদের মজুরিও বেড়েছে। সুতরাং গরুর দাম গতবারের তুলনায় এবার বেশি চাইছেন তারা।

মানিকগঞ্জের ইদ্রিস বললেন, গত বছর মাঝারি সাইজের যেসব গরু তারা ৮০ থেকে ৮৫ হাজারে বিক্রি করেছেন। এবার সেই একই আকারের গরুর জন্য দাম চাইছেন ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার। ১ লাখ ১০ হলে তা বিক্রি করে দেবেন।

গ্রিন রোডের ঢাকা টাওয়ারের বাসিন্দা মোহাম্মদ ফিরোজ ৯৪ হাজার টাকা দিয়ে গরু কিনলেন গাবতলীর পশুর হাট থেকে। এরপর উশুল দিলেন ৪ হাজার ৭০০ টাকা। এরপর হাজারে ১০০ টাকা করে কসাইকে দিতে হবে। গরুর বিক্রেতার কথা মতো ১১০ কেজি মাংস হতে পারে গরুটির। মোহাম্মদ ফিরোজ বললেন, বাজারের গরুর মাংস যে দামে বিক্রি হয় তার চাইতে কোরবানির গরুর দাম অনেক বেশি পড়ে। তার মানে, গরু বিক্রেতারা কসাইদের তুলনায় আমাদের কাছে দাম অনেক বেশি রাখছে। সাধারণ ক্রেতারা ফড়িয়া আর গরু ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি হয়ে গেছে।

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত বছর দেশে পশুর চাহিদা ছিল ১ কোটি ২১ লাখ। এর বিপরীতে কোরবানি হয়েছিল ৯৯ লাখ। এ বছর চাহিদা ও জোগান দুটোই বেড়েছে। হাটে পশুর সরবরাহ আছে ১ কোটি ২৫ লাখের বেশি। সরকারি হিসাবে পশুর সম্ভাব্য চাহিদা হবে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ ৯৬ হাজার। উদ্বৃত্ত থাকবে ২১ লাখের বেশি।

এদিকে, বিভিন্ন হাটে ঘুরে দেখা গেল বিক্রি খুবই কম হচ্ছে। গতকাল সোমবার বিকাল ৫টার সময় হাজারিবাগ ইজারাদারের অফিস থেকে জানা গেল, সারা দিনে ৫৪টি গরু বিক্রি হয়েছে। হাটে যারাই আসছেন সবাই বলছেন, দাম খুব চড়া। ব্যাপারিরা যদি দাম না কমায় তাহলে অনেক গরুই ফেরত যেতে পারে।

বিক্রেতারা সবাই তাকিয়ে আছে আজ মঙ্গলবার থেকে বিক্রি শুরুর আশায়। কুষ্টিয়ার গরু বিক্রেতা আমিরুল ১৫টা গরু নিয়ে এসেছেন হাজারীবাগ পশুর হাটে। তিনি জানালেন,  বিক্রি এখনো সেভাবে শুরু হয়নি। তবে আশা করি, মঙ্গলবার সরকারি ছুটির দিন থেকে বিক্রি বাড়বে।