কোরবানির পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও পরবর্তী লক্ষ্য

গত তিন বছর থেকে প্রতিবেশী দেশ কর্তৃক স্থল সীমান্ত পথে গরু বিক্রির ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করে দেওয়ায় আমাদের দেশে নিজস্ব উদ্যোগে পশু মোটাতাজাকরণ প্রকল্প বেগবান হয়েছে। এতে কৃষক ও অন্যান্য শৌখিন উদ্যোক্তাগণ বেশ লাভবান হচ্ছেন। অনেকে এজন্য সারা বছর ধরে কোরবানি ঈদের চাঙ্গা বাজার ধরতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন। তবে মোটাতাজাকরণ যাতে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক চাষি এবং ঋণ নিয়ে কাজ করে বেঁচে থাকার জন্য যারা দুই-একটি গরু মোটাতাজাকরণের মতো ছোট প্রকল্প নিয়ে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, তাদের জন্য বিশেষ সামাজিক বিমার ব্যবস্থা করা দরকার। সামাজিক বিমা হলো সামাজিক নিরাপত্তাদানের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার

এক সময় আমাদের কোরবানির পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ছিল না। প্রতিবেশী দেশ থেকে কোরবানির পশু না এলে কোরবানির হাটে হাহাকার পড়ে যেত। এখন সেই পরিস্থিতি আর নেই। এবার পবিত্র ঈদুল আজহায় লক্ষ করা গেছে, ক্রেতারা কোরবানির ক্ষেত্রে দেশীয় পশুর প্রতিই আস্থা রেখেছেন। বিষয়টি দেশীয় খামারি ও উদ্যোক্তাদের জন্য খুবই আশাব্যঞ্জক।

পবিত্র ঈদুল আজহার আগে এবার মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম দেশবাসীকে জানান যে, এবার কোরবানির জন্য চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত পশু আছে। তার মতে, এ বছর কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল ১ কোটি ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭৩৯টি। বিপরীতে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৫ লাখ ৩৬ হাজর ৩৩৩টি। ঈদের আগে গত ১৪ জুন সকালে সচিবালয়ে কোরবানির পশু ব্যবস্থাপনা নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠক শেষে এ তথ্য জানান তিনি। তিনি বলেন, চাহিদার চেয়ে বেশি থাকায় এবার ভারত বা মিয়ানমার থেকে কোরবানির পশু আমদানি করতে হবে না। কোরবানির সময় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে যেন গরু আসতে না পারে, এজন্য তার মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠিও প্রদান করে। ঈদের পর দেখা যাচ্ছে, তার বক্তব্যই সঠিক। কেননা এবার কয়েক লাখ পশু কম কোরবানি হয়েছে। কোথাও পশু সরবরাহে কোনো ঘাটতি ছিল না।

ভারত নির্ভরশীলতা কমিয়ে কোরবানির পশুতে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। এতে সমৃদ্ধ হচ্ছে আমাদের গ্রামীণ ও পারিবারিক অর্থনীতি। ব্যাপক কর্মসংস্থান হচ্ছে গ্রামীণ জনপদে। এবারও চমক দেখিয়েছে আমাদের গ্রামীণ পশু শিল্প। সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লাভজনক মনে করে গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ এখন গরু পালন করছেন। কোরবানিতে পশু বিক্রয়ের মাধ্যমে বছরের বৃহত্ অংশ জুড়ে তারা তাদের পরিবারের ব্যয়নির্বাহ করছেন। তাদের অপরিসীম পরিশ্রমের কারণে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্জন করেছি গরু ও ছাগল উত্পাদনে। এতে দারিদ্র্যবিমোচনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের হাজার হাজার নারী-পুরুষের। একই সঙ্গে দেশের মাংসের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশি মুদ্রার সাশ্রয় হচ্ছে। কয়েক বছর আগেও দেশের মাংসের চাহিদার বড় অংশ মিটত প্রতিবেশী দুই দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে গরু আমদানি করে। বর্তমানে সে চিত্র আর নেই।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশে গরু আসা বন্ধ করে দেয়। এটা আমাদের জন্য শাপেবর হয়। এতে বাজারের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশে গবাদিপশুর লালনপালন ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। দেশে প্রতিবছর ২৫ শতাংশ হারে গবাদিপশুর খামার বাড়তে শুরু করে। ভারতীয় গরু আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে কয়েক বছর সময় লাগলেও এটি এখন বাংলাদেশের গ্রামের অর্থনীতির অন্যতম ভিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত ও মিয়ানমারের ওপর নির্ভরশীলতা বন্ধ করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আগামী কয়েক বছরে ঘুরে দাঁড়াবে। তবে চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে পারলে গ্রামীণ এই শিল্প আরো সমৃদ্ধশালী হবে। পদ্মা সেতু চালুর ফলে কোরবানির পশু ক্রয়-বিক্রয়ও বেড়েছে। এতে খামারিরা ন্যায্য দাম পেয়েছেন। গরু বিক্রি থেকে খামারিরা একটা আয় পায়। সব খরচ বাদ দিয়েও একটি গরুতে অন্তত হাজার দশেক টাকা থাকে। গ্রামের একটি পরিবারের প্রতিদিনের যে প্রয়োজন সেটি অন্যান্য শস্যের মাধ্যমে পূরণ হয়। কোরবানির পশু বিক্রি থেকে তারা একটি থোক টাকা পায়। এর মাধ্যমে তারা সারা বছর নগদ টাকার চাহিদার কিছু অংশ পূরণ করে। দেখা যাচ্ছে, ঈদুল আজহার পশু বিক্রির জন্য যে যতবেশি বিনিয়োগ করবে সে ততবেশি লাভ পাবে। দেশের ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণের একটি অন্যতম ক্ষেত্র ও গ্রাহক হলো খামারিগণ। এর মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সম্পৃক্ত। গ্রামীণ এই শিল্পকে কেন্দ্র করে গরুর খাদ্যের চাহিদা মেটাতে অব্যবহূত কৃষি জমিতে ঘাসের চাষ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য অন্যতম পণ্য পশুর চামড়ার জোগানও আসছে এই খাত থেকে। বিশ্ববাজারে এ দেশের সব ধরনের চামড়ার চাহিদা রয়েছে। বিশ্বে প্রথম শ্রেণির চামড়া ও চামড়া জাত প্রস্তুতকারী দেশ হিসাবে বাংলাদেশের নাম এখন আলোচিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, চামড়া সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করা গেলে এবং সরকার এর প্রতি আন্তরিক হলে বছরে ৬০০ কোটি ডলারের চামড়া পণ্য রপ্তানি সম্ভব। গ্রামীণ অঞ্চলে কেউ শখের বশে, কেউ বেকারত্বের অভিশাপ ঘোচাতে, কেউ সংসারে সচ্ছলতা আনতে এসব খামার গড়ে তুলেছেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই শিল্পে শিক্ষিত তরুণরাও জড়িয়ে পড়েছেন। অনলাইনে কোরবানির পশু কেনাবেচার কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করছেন তারা। অনেক তরুণ শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে ছোটবড় খামার গড়ে তুলেছেন। এবারও পশু খাদ্যের দাম বাড়ায় গরু-ছাগল পালন করতে খরচও বেশি হয়েছে। ঈদুল আজহার সময় বিদেশি গরুর প্রবেশ বন্ধ আর পশুখাদ্যের দাম কমানোর দাবি জানিয়েছেন খামার মালিক ও বেপারিরা। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, মোট আমিষের ৭৬ ভাগ আসে প্রাণিসম্পদ থেকে। তবে সারা বছর ধরে পশুসম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হলে খামারিদের গো-পালনে আরো উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এজন্য পশু ডাক্তারদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ প্রয়োজন। প্রয়োজন প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সরবরাহ করা। খামারিদের সহজ-শর্তে ব্যাংক ঋণ প্রদান করা। বিশেষ করে যেসব তরুণ উদ্যোক্তা এই খাতে বড় আশা নিয়ে সম্পৃক্ত হয়েছেন, তাদের স্বপ্নপূরণে সরকারকে তাদের সারথি হতে হবে।

আমাদের অর্থনীতিতে কোরবানির পশুর ভূমিকা বড় হয়ে দেখা দেওয়ায় অল্প সময়ে পশু মোটাতাজাকরণ প্রকল্প হাতে নিয়ে লাভবান হওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। এই প্রকল্পে দ্রুত বর্ধনশীল সংকর জাতের বিদেশি গরু বেশি পালন করা হয়। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ঋণ দেওয়ার নিয়ম চালু হওয়ায় দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা এই লাভের প্রতি ঝুঁকে পড়েছেন। পাশাপাশি এটাকে বড় লাভের উৎস হিসেবে বিবেচনা করে বিত্তশালী লোকেরা নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন হাজার হাজার পশুর খামার। সেগুলোতে ছোট ছোট উন্নত সংকর জাতের গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া, দুম্বা, উট ইত্যাদি সংগ্রহ করে বড় ও মোটাতাজা করে প্রতিবছর কোরবানি ঈদের আগে হাটে বিক্রির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গ্রাম-শহর সব জায়গায় এই প্রবণতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গত তিন বছর থেকে প্রতিবেশী দেশ কর্তৃক স্থল সীমান্ত পথে গরু বিক্রির ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করে দেওয়ায় আমাদের দেশে নিজস্ব উদ্যোগে পশু মোটাতাজাকরণ প্রকল্প বেগবান হয়েছে। এতে কৃষক ও অন্যান্য শৌখিন উদ্যোক্তাগণ বেশ লাভবান হচ্ছেন। অনেকে এজন্য সারা বছর ধরে কোরবানি ঈদের চাঙ্গা বাজার ধরতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন। তবে মোটাতাজাকরণ যাতে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক চাষি এবং ঋণ নিয়ে কাজ করে বেঁচে থাকার জন্য যারা দুই-একটি গরু মোটাতাজাকরণের মতো ছোট প্রকল্প নিয়ে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন তাদের জন্য বিশেষ সামাজিক বিমার ব্যবস্থা করা দরকার। সামাজিক বিমা হলো সামাজিক নিরাপত্তাদানের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। ডিজিটাল যুগে মানুষের চিরায়ত সামাজিক বন্ড ও আস্থা শিথিল হওয়ায় সামাজিক ভাঙন দ্রুততর হচ্ছে। এটা ঠেকাতে বাজেটের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের যৌক্তিক ব্যবহার করে হতাশ প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের সমস্যার দ্রুত সুরাহা হওয়া উচিত।

এবার একজন কৃষক ঈদের পূর্বে আমাকে ফোন দিয়ে জানিয়েছিলেন যে, তার ছোট গরুটার ভীষণ জ্বর। খড়, ঘাস কিছুই খায় না, মুখ দিয়ে লালা পড়ে। সমস্ত গায়ে গুটি গুটি চাকা উঠে ফুলে গেছে। কাঁপুনির জন্য ঠিকমতো হাঁটতেও পারে না। শুকিয়ে পাঁজরের শরীরের হাড্ডি বের হয়ে পড়েছে। তার গরুর এই অসুস্থতায় তিনি অস্থিরতা প্রকাশ করেছিলেন। এ বছর গবাদি পশুর লাম্পিং স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) নিয়ে বেশ লেখালেখি হয়। গরুর শরীরে গোটা উঠে ফুলে যাওয়ায় এটাকে গো-বসন্ত বলা হয়। এটা পশুর জন্য ভয়ংকর পক্স ভাইরাস। এটাকে খুরা রোগের চেয়ে ভয়ংকর হিসেবে ধরা হয়। এই ভাইরাস  দ্রুত এক গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়ে। বসন্তের শুরু এবং বর্ষার শেষে মশামাছির অধিক বংশবিস্তার হলে এই ভাইরাস বেশি ছড়ায়। এবছর মে মাসের শেষে সাতক্ষীরা, যশোরে এর প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছে। শুধু তাই নয়, দেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম ও পূর্বাঞ্চলের নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার সর্বত্র এর প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। মে ৩১ তারিখে কুড়িগ্রাম জেলায় একটি এলাকায় কৃষকদের ১০টি গরু লাম্পিং স্কিন ডিজিজে মারা যাওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হয় । এই রোগের সরাসরি কোনো প্রতিষেধক নেই, তাই সাধারণ চিকিত্সা দেওয়া হয়। গরুর লাম্পিং স্কিন ডিজিজ প্রায় শত বছর পূর্বের পুরোনো রোগ হলেও অদ্যাবধি এর কোন টিকা আবিষ্কৃত হয়নি। কেন হয়নি তা একটি বিস্ময়কর ব্যাপারই বটে! গরুর লাম্পিং স্কিন ডিজিজ নামক এই রোগটি ১৯২৯ সালে সর্বপ্রথম আফ্রিকার জাম্বিয়ায় ধরা গড়ে। এরপর ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সব এলাকায় এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে। এই রোগে সাধারণত সংকর জাতের গরু বেশি আক্রান্ত হয়। পশুপালন শিল্পের উন্নয়নে এই প্রতিবন্ধকতাও দূর হওয়া দরকার।

আমরা চাই, শুধু কোরবানির পশু নয়, সার্বিকভাবে পশু সম্পদে আমরা যেন স্বাবলম্বী হই। এটাই হওয়া উচিত। আমাদের পরবর্তী টার্গেট বা লক্ষ্য, যাতে গরুর মাংসের দাম একসময় অন্তত ৫০০ টাকায় নেমে আসতে পারে। এজন্য খামারগুলোর উন্নয়নে আরো মনোযোগ দিতে হবে। লাম্পিং স্কিন ডিজিজসহ পশুর সব রকম অসুখ-বিসুখের চিকিৎসা আরো সুলভ করতে সচেষ্ট হতে হবে।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন