বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ৭ দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার ফিশিং বোটসহ ১৬ জেলে। সোমবার (২৬ জুন) রহমান বদ্দার ও আবুল বদ্দার নামক দুই সহোদর ইঞ্জিন চালিত ৩টি বোট নিয়ে গভীর বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকারে যায়। পরদিন মঙ্গলবার ভোর ৪টায় প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়েন। ওই সময় আবুল বদ্দার ও মাঝিমাল্লারা ২টি বোটসহ ফিরে আসতে পাড়লেও নিখোঁজ হন রহমান বদ্দার সহ ১৬ জেলে। ৭ দিন ধরে ১৬ জেলে নিখোঁজ হলেও এ বিষয়ে কিছুই জানেন না সংশ্লিষ্ট এলাকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কিংবা স্বজনকে হারিয়ে ভোলাবাসী দিশেহারা। বৃদ্ধ বাবা-মা খুঁজছে সন্তানকে, স্ত্রী খুঁজছে স্বামীকে আর সন্তান খুঁজছে তার বাবাকে। শোকাবহ পরিবারগুলোতে ঈদ আনন্দের পরিবর্তে বইছে শোকের মাতম। এদিকে আবুল বদ্দার ২টি ট্রলার নিয়ে শনিবার দুপুরে হারানোদের খুঁজতে সাগরে যাত্রা শুরু করছে বলে তার পরিবার সূত্রে জানা যায়।
গংগাপুর ইউনিয়নে ৮নং ওয়ার্ডের মেম্বার, মৎস্য আড়তদার কালাম বদ্দার এবং নিখোঁজ রহমান বদ্দার বৃদ্ধ বাবা দেলোয়ার হোসেন জানান, ২৬ জুন তার ছেলে ১৬ জন মাঝি-মাল্লা নিয়ে চরফ্যাশন উপজেলার নুরাবাদ ঘাট থেকে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যায়। অপর ছেলে আবুল বদ্দার একই উপজেলার স্বামরাজ ঘাট থেকে ২ ট্রলার নিয়ে সাগরে যায়। পরদিন ২৭ জুন সাগরে প্রচণ্ড ঝড় উঠে। আবুল বদ্দার তার মাঝি মাল্লা নিয়ে এলাকার আসলেও রহমানসহ ১৬ জেলে ৭ দিন চলে গেলেও এখনো ফেরেনি। পরিবারের ধারণা ঝড়ের কবলে পড়ে তারা দুর্ঘটনার শিকার হন।
নিখোঁজ জেলেদের মধ্যে রয়েছে গংগাপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের দেলোয়ার বদ্দারের ছেলে বোটমালিক রহমান বদ্দার, ৯নং ওয়ার্ডের নুরুল হক মিস্ত্রির ছেলে মাঝি আব্বাস, তার খালু চুন্নু, মামা হাসান, সিদ্দিক তালুকদারের ছেলে নেছার, ৮নং ওয়ার্ডের ইউছুব মাতাব্বর এর ছেলে আকতার, ইয়াকুব মাঝির ছেলে আলামিন, রহিম এর ছেলে ইলিয়াস, রহিম হাওলাদারর ছেলে নজু, শাহাজান এর ছেলে কবির, তাজল মাতাব্বরের ছেলে মুন্না, ইসলাম ডাক্তারের ছেলে কুট্টি, সাদেক এর ছেলে ইসমাইল, হাবু, ইলিয়াস, আজগর আলী। আজগর আলী কাচিয়া ইউনিয়নের হলেও অন্যরা গংগাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা।
শনিবার বিকেলে গংগাপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন রহমান বদ্দারের ঘরে গিয়ে দেখা যায়, তার বয়োবৃদ্ধ বাবা দেলোয়ার বদ্দার হাউমাউ করে কাঁদছে। চোখের জল গঁড়াচ্ছে। নাতি শামীম (১০) আর হামিম (৫) এবং নাতনিকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
তিনি বলেন, ‘সাগরে যাওয়ার আগে তার সাথে কথা হয়েছিল ঈদের পরদিন বাড়িতে আসছে। সাধারণত ৩ থেকে ৪ দিন বোট সমুদ্রে থাকে। ৭ দিন চলে গেলেও আমার ছেলে আসছে না। আল্লা আমাকে রেখে কেন ছেলেকে নিয়ে গেল?’
একটু পূর্ব পাশে নিখোঁজ জেলে আকতারের বাড়ি। সেখানে গিয়ে এক হৃদয়বিদারক পরিস্তিতি দেখা যায়। নিখোঁজের স্ত্রী সোনিয়া আর বৃদ্ধ শ্বশুর ইউছুব সামনের সিঁড়িতে বসে কাদঁছেন।
সোনিয়া বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমার একমাত্র ছেলেটি মারা যায়। বাবা-মা কেউ নেই। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি আমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে। কে আমাকে দেখবে? ছোট মেয়েটি নিয়ে আমি কীভাবে বাঁচব?’ তার শঙ্কা স্বামী আর বেঁচে নেই।
তিনি আরও বলেন, ‘সর্বশেষ স্বামী তাকে মোবাইলে বলেন, ‘‘আমি সমুদ্রে যাচ্চি (যাচ্ছি) , দোয়া করিও (করো), আমার মেয়েকে দেখবা’’।’ উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে বাকরুদ্ধ সোনিয়া।
আকতারের বাবা ইউছুব বলেন, ‘ওখানে এই স্বাভাবিক, এই ভয়ঙ্কর। সমুদ্রে ঝড় উঠলে বাঁচার একমাত্র উপায় আল্লাহ।’
নিখোঁজ তাজল মাতাব্বরের ছেলে শাকিলের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার বড় ভাই রাশেদের সঙ্গে।
রাশেদ বলেন, ‘আমার সাথে সর্বশেষ ২৭ তারিখে ফোনে কথা হয়। ঈদের পরদিন আসার কথা ছিল। পরিবারের সবার ছোট। এখনও বিয়ে করেনি।’ মোবাইল ফোন থেকে ভাইয়ের ছবি দেখিয়ে হাউমাউ করে কাঁদছে রাশেদ।
নিখোঁজ ইউছুবের বড় ভাই আবুল বশার জানান, তার ভাইয়ের ১ ছেলে ১ মেয়ে। কে ওদের দেখবে? কী ভাবে চলবে পরিবারটি? এক কথায় গোটা তেতুঁলিয়ার পাড় শোকার্ত পরিবারগুলোর হাহাকার চলছে।
নিখোঁজ ভাই ও তার মাঝিমাল্লাদের খুঁজতে যাওয়া আবুল বদ্দার শনিবার রাতে মুঠোফোনে জানান, সে এখন চরফ্যাশন স্বামরাজঘাটে অবস্থান করছে। রবিবার সকালে আবহাওয়ার পরিস্থিতি দেখে নিখোঁজ ভাইকে খুঁজতে গভীর সমুদ্রে রওনা দিবেন।
তিনি বলেন, ‘আমি কালকিনি দিয়ে আর ভাই সোনার চর এলাকা দিয়ে সমুদ্রে যাই। খুব ভোর রাতে আমরা প্রচণ্ড ঝঁড়ের মধ্যে পড়ি। আমি আসতে পারলেও ভাইসহ ১৬ জেলে এখনও নিখোঁজ ‘
সামুদ্রিক মৎস্য কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, বিষয়টি আজকে জানতে পারছি। আমি খোঁজখবর নিচ্ছি।
বোরহানউদ্দিন উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জামাল হোসেন বলেন, ‘এ সম্পর্কিত কোন তথ্য আমার জানা নেই।’
গংগাপুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘বিষয়টি দু:খজনক। নিখোঁজ জেলে পরিবারের জন্য আমার সামর্থ অনুসারে সহযোগিতা প্রদান করব।’
বোরহানউদ্দিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নওরীন হক বলেন, ‘নিখোঁজদের পরিবারের কেউ আমাদের সাথে যোগাযোগ করেনি। তবে ঘটনার খোঁজ খবর নিচ্ছি।’
কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কে. এম. শফিউল কিঞ্জল বলেন, ‘এ বিষয়ে কেউ রিপোর্ট কিংবা অভিযোগ দেয়নি। কোন তথ্যও নেই।’