ঈদগাঁও উপজেলা কমপ্লেক্স নিকার প্রস্তাবিত জমিতেই করার দাবি

কক্সবাজার জেলার নবগঠিত ঈদগাঁও উপজেলার সদর দপ্তরের জন্য প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সিদ্ধান্তে প্রস্তাবিত জমিতেই প্রশাসনিক ভবন তৈরির দাবি জানিয়েছেন ঈদগাঁও উপজেলার সচেতন নাগরিকরা। 

স্থানীয় সরকারের সাবেক এক পদস্থ কর্মকর্তা নিকারের সিদ্ধান্তের পর তথ্য গোপন করে তার পৈত্রিক নিবাসের পাশে তিন ফসলি জমিতে উপজেলার প্রশাসনিক ভবন তৈরির প্রক্রিয়া করায় স্থানীয় জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। নিকার সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে মহাসড়কের পাশের খালি জায়গায় প্রশাসনিক কার্যালয় স্থাপন না করে লোকালয়ের মাঝখানে ইউএনও অফিস হলে নতুন করে সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। এ ছাড়া নির্মিতব্য রেললাইনের পাশে বহুতল ভবন হলে তা হবে অনিরাপদ। তাই নিকার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তারা। 

coxbazar-2

মঙ্গলবার (৪ জুলাই) দুপুরে কক্সবাজার প্রেসক্লাবে ঈদগাঁও উপজেলার সচেতন নাগরিকবৃন্দের ব্যানারে সংবাদ সম্মেলনে ঈদগাঁও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছৈয়দ আলম বলেন, ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজার সদরের ৫টি ইউনিয়ন নিয়ে নতুন ঈদগাঁও উপজেলা ঘোষণা করেন। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ‘নিকারে’ উক্ত উপজেলা সদর দপ্তর ঈদগাঁও ইউনিয়নের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক সংলগ্ন ঈদগাঁও কলেজের পার্শ্ববর্তী খালি স্থানটি নির্ধারণ করা হয়। নতুন উপজেলা সদর দপ্তর স্থাপনের বিধিমালায় বলা আছে এমন জায়গা নির্ধারণ করতে হবে যেখানে কাছাকাছি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিস, বিদ্যুৎ অফিস, স্কুল, কলেজ রাস্তা, হাটবাজার, ব্যাংক, বীমা ও সরকারি হাসপাতাল ইত্যাদি সুবিধা থাকে। কলেজের পাশের প্রথম প্রস্তাবিত জায়গাতে নাগরিক প্রায় সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান। এটি পছন্দ করে নিয়মিত অফিস কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিগত ২০২১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রস্তাবিত জায়গার প্রতিবেদন চেয়ে স্থানীয় সরকার শাখা কক্সবাজার হতে একটি চিঠিও ইস্যু করা হয়। এ জমিতে প্রশাসনিক ভবন হলে বেশ কিছু খাস জমি অধিগ্রহণে আসবে। ফলে সরকারি টাকার অপচয় রোধ সম্ভব। 

তিনি আরও বলেন, প্রথম জমির বিষয়ে প্রতিবেদন চাওয়ার প্রায় এক মাস পর স্থানীয় সরকারের উচ্চ পদে থাকা (বর্তমানে সাবেক হয়েছেন) ইসলামাবাদ ইউনিয়নের এক ব্যক্তির ইশারায় তারই দুই প্রতিবেশীকে দিয়ে উপজেলার স্থান নির্ধারণ বাস্তবায়ন কমিটির ব্যানারে একটি আবেদন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর করানো হয়। সেখানে তারা লেখেন, ইসলামাবাদের গর্বিত সন্তন হিসেবে ইসলামাবাদ রেল স্টেশনের পাশে ১০ একর ধানি জমিতে উপজেলার প্রশাসনিক ভবন স্থাপনের ব্যবস্থা করলে আপনার গৌরবের পাশাপাশি এলাকাবাসী উপকৃত হবে এবং ইউনিয়নের সন্তান হিসেবে যুগ যুগ আপনার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এ আবেদনের প্রেক্ষিতে পূর্বের ফাইল থেকে ডিজিটাল ট্রেস ও ১৫ সেপ্টেম্বরের চিঠি সরিয়ে ১১ অক্টোবর জেলা প্রশাসককে ইসলামাবাদে স্থান নির্ধারণ করতে স্থানীয় সরকার বিভাগ হতে পত্র দেয়া হয়। এরপরই শুরু হয় রশি টনাটানি। আমরা চাই, মূল ভবনটি নিকার প্রস্তাবিত স্থানে হয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য বিভাগ গুলো আশপাশের ইউনিয়নে গড়ে উঠুক।

coxbazar-3

চেয়ারম্যান ছৈয়দ আলমের মতে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা কোন স্থাপনা গড়তে ফসলি জমি নষ্ট করা যাবে না। ইসলামাবাদের যেখানে উপজেলা হেডকোয়ার্টার করার প্রক্রিয়া চলছে তা ঈদগাঁও রাবার ড্রামের আওতাধীন ৩ ফসলা জমি এবং এখানে কোনো ধরণের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নেই। এখানের কৃষি জমি নষ্ট করে উপজেলা ভবন করলে রাবার ড্যামের সুবিধা পাওয়া ৮০০ হেক্টর জমি ক্ষতির মুখে পড়ে অকার্যকর হবে। যোগাযোগের জন্য বড় করতে হবে সরু সড়ক। আর সম্পূর্ণ কৃষি জমি অধিগ্রহণ করে ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় ৪০ কোটি টাকার পাশাপাশি ফসলী জমিও গচ্চা যাবে। অন্যদিকে প্রথম পছন্দ ঈদগাঁও কলেজের পাশের জমি অধিগ্রহনে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির পরিমাণ কম ও খাস জমি থাকায় টাকা পরিশোধ করতে হবে কম। নতুন গড়তে হবে না সড়ক। তাই অধিকতর জনকল্যাণকর স্থানে (নিকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক) নবগঠিত উপজেলা ভবন করার দাবি জানাচ্ছি।

এদিকে, ঈদগাঁও উপজেলার নতুন প্রশাসনিক ভবন গড়ার জটিলতা নিরসনকল্পে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) একটি মতামত দিয়েছে। কউকের নগর পরিকল্পনা বিভাগ হতে ২০২২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি দেয়া পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়, নবসৃষ্ট ঈদগাঁও উপজেলা বিদ্যমান মহাপরিকল্পনা এলাকার বাইরে কিন্তু কউকের অধিক্ষেত্রের আওতাধীন। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঈদগাঁও ইউনিয়নের প্রস্তাবিত সাইট চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক সংলগ্ন। সাইটের পারিপার্শ্বিক ভূমি ব্যবহারের মধ্যে থানা, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, স্টেডিয়াম এবং বাণিজ্যিক (শপিংমল, বাজার, ব্যাংক ইত্যাদি) ভূমি ব্যবহারের আধিক্য লক্ষ্যণীয়। ঈদগাঁও ইউনিয়নের প্রস্তাবিত সাইট ঈদগাঁও স্টেশন হতে প্রায় ৫০০ মিটারে এবং ভৌগোলিক দৃষ্টিকোন হতে নিকার প্রস্তাবিত ঈদগাঁও স্টেশন সংলগ্ন জায়গাটি নবসৃষ্ট উপজেলার অনেকটা মাঝামাঝি অবস্থিত। যা উপজেলাবাসীর জন্য সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে সহজতর এবং দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে সরকারের বিভিন্ন সেবা প্রদানের উদ্দেশ্য সহায়ক হবে। 

coxbazar-4

অন্যদিকে, ইসলামাবাদ ইউনিয়নের প্রস্তাবিত সাইট চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক হতে প্রায় ২কিলোমিটার দূরে। ভূমির মাঝে কৃষি ব্যবহারের আধিক্য থাকায় প্রশাসনিক ভবন করতে গেলে শ্রেণি পরিবর্তন আবশ্যক। এতে ইউনিয়নের কৃষি নির্ভর জনগণের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। ইসলামাবাদের প্রস্তাবিত স্থানটি নিকটবর্তী ঈদগাঁও রাবার ড্যামের সেচ সুবিধাপ্রাপ্ত প্রায় ৮০০ হেক্টর কৃষি জমির আওতাধীন। ফলে উক্ত স্থানে উপজেলার প্রশাসনিক দপ্তরসমূহ প্রতিষ্ঠা করা হলে রাবার ড্যাম দ্বারা সেচ সুবিধাপ্রাপ্ত জমির পরিমাণ হ্রাস পাবে, কমে যাবে রাবার ড্যামের উপযোগিতাও। তাই উপজেলা কমপ্লেক্স স্থাপনে ঈদগাঁও ইউনিয়নের সাইটটি ইসলামাবাদের প্রস্তাবিত সাইটের চেয়ে অধিক উপযুক্ত।

কক্সবাজারের প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন বলেন, রেল লাইনের পার্শবর্তী স্থাপনাগুলো ধীরে ধীরে শক্তিহীন হয়ে যায়। তাই দেখেশুনে রেল লাইনের পাশে উপজেলা কমপ্লেক্স গড়া বোকামির সামিল। 

সংবাদ সম্মেলনে ঈদগাঁও বাজারের ব্যবসায়ী জাফর আলম, মুহাম্মদ ছৈয়দ, এহেসান বাবুল, মুহাম্মদ ইউনূস ড্রাইভার, মুহাম্মদ আবু ছালেহসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।