চিকিৎসাসেবায় অবহেলা আইন ও নৈতিকতার পরিপন্থি 

বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে চিকিৎসাকে মৌলিক চাহিদার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা থেকে সহজেই বোঝা যায়, চিকিৎসা ও চিকিৎসকদের গুরুত্ব কতখানি। জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে একজন অসুস্থ ব্যক্তি চিকিৎসকের কাছে নিজেকে অগাধ বিশ্বাসে সঁপে দেন। আর চিকিৎসকরাও পরম যত্ন ও মমতায় রোগীর সুস্থতায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। সেজন্যই যুগ যুগ ধরে চিকিৎসা সর্বজনস্বীকৃত ‘একটি মহান পেশা’ আর চিকিৎসকেরা ‘মহান ব্রতে নিবেদিত প্রাণ’। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিভিন্ন সময় কিছু ডাক্তারের বিরুদ্ধে ঘোরতর অবহেলার অভিযোগ উঠতে দেখা যায়! দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সম্প্রতি গ্রেফতার হয়েছেন দুই জন ডাক্তার। আসলে যে দায়িত্ব যত গুরুত্বপূর্ণ, সে দায়িত্বে অবহেলার পরিণতি তত ভয়ংকর। 

ডাক্তারদের মধ্যে এমন অবহেলা ও অসাবধানতা বৃদ্ধি পাওয়ার মূল কারণ তিনটি। প্রথমত, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে  রোগীর সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে ডাক্তারের সংখ্যা বাড়েনি। দ্বিতীয়ত, জবাবদিহিতা এবং শাস্তির বিষয়ে নড়বড়ে দশা। তৃতীয়ত, ডাক্তারদের মধ্যে সেবার চেয়ে উপার্জনের আগ্রহ বৃদ্ধির প্রবণতা। গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, উক্ত তিনটি কারণ একই সূত্রে গাঁথা!

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যে কোনো দেশে প্রতি ১ হাজার মানুষের জন্য এক জন ডাক্তার থাকা উচিত; কিন্তু বাংলাদেশে প্রতি আড়াই হাজার মানুষের জন্য রয়েছেন একজন ডাক্তার, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। সবচেয়ে বড় জটিলতা সৃষ্টি হয় সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার কম থাকায়। অনেক রোগী সরকারি হাসপাতালে প্রত্যাশিত সেবা না পেয়ে ছোটেন বেসরকারি হাসপাতালে। যার ফলে অর্থসংকটসহ নানা ঝামেলায় পড়তে হয় ভুক্তভোগী সেবাগ্রহীতাদের। এতে করে তাড়াহুড়োর ফলে অনেক প্রসূতি মায়ের পেটে কাঁচি রেখেই সেলাই করার মতো ঘটনা ঘটতে দেখা যায়—কী সাংঘাতিক কথা! এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় ধস নামবে, যা কাম্য নয়। এমতাবস্থায়, যে কোনোভাবেই হোক, উল্লিখিত সমস্যার লাগাম টানতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে মানসম্পন্ন ডাক্তারদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত ডাক্তার নিয়োগ দিতে হবে এবং দায়িত্বে অবহেলা করছে কি না, তার জোর তদারক করতে হবে। ডাক্তারের পাশাপাশি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত নার্স ও টেকনিশিয়ানদের সংখ্যাও বাড়াতে হবে। আমাদের বেশির ভাগ হাসপাতালে আধুনিক প্রযুক্তির নাজেহাল অবস্থা, এই দশার উত্তরণ জরুরি। তাছাড়া অভিযুক্ত ডাক্তারদের আইনের আওতায় আনতে হবে। 

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তৎকালীন পিজি হাসপাতালের একটি অনুষ্ঠানে ডাক্তারদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘পয়সা দিয়ে মানবতাবোধ কেনা যায় না বা সৃষ্টি করা যায় না। সেবার মনোভাব না থাকলে যত পয়সা দেওয়া হয় না কেন, প্রকৃত সেবা দিতে পারবেন না।’ বঙ্গবন্ধুর বহু বছর আগের কথা আজও অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়!

চিকিৎসকদের সব সময় মনে রাখতে হবে, একজন আদর্শ চিকিৎসক তার সেবার মাধ্যমে সরাসরি স্রষ্টার প্রতিনিধিত্ব করেন। অতএব, এই মহান পেশার মাহাত্ম্য ধরে রাখা অপরিহার্য। সেবাগ্রহীতা তথা জনগণকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। সর্বোপরি, চিকিত্সাব্যবস্থা পরিশুদ্ধ করতে অসাধু চিকিত্সকসহ এ খাতে বিরাজমান জটিলতা ও অনিয়মের মূলোৎপাটন সময়ের দাবি।

লেখক : শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়