গত ২৩ মে রাজধানীর গুলশানে একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের ১৫ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ছিনতাইয়ের ঘটনাটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করে দেখতে পায় যে ঐ ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে সুদূর আমেরিকা থেকে। আমেরিকায় আত্মগোপন করা পলাতক সন্ত্রাসী সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল ও মেহেদী হাসানের পরিকল্পনায় ঐ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, যে চার ছিনতাইকারী টাকা ছিনতাই করেছিল, তারা সবাই চঞ্চল ও মেহেদির পাঠানো ক্যাডার বাহিনী। ছিনতাইয়ের ঘটনায় ডিবি চার জনকে গ্রেপ্তার করে তাদের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য পায়।
এ ব্যাপারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ বলেন, গুলশান-বাড্ডা এলাকায় কিছু লোক সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত আছে। অনেকে চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়েও জড়িত। এ রকম কয়েক জনকে আমরা গ্রেপ্তারও করেছি। ধরা পড়ার পর প্রায় ক্ষেত্রেই তারা বলে থাকেন, তারা চঞ্চল বা মেহেদির লোক।
রাজধানীর গুলশান-১ নম্বরে গুলশান শপিং সেন্টারের পঞ্চম তলায় বি-৫০০/২৯ নম্বর দোকানে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আরিফ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল। ২৩ মে সারা দিনের বিক্রির ১৫ লাখ টাকা একটি ব্যাগে করে প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী জিল্লুর রহমান রওনা দেন উত্তর বাড্ডায় ছয়তলা মসজিদের কাছে মালিকের বাসায়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে উত্তর বাড্ডার ছয়তলা মসজিদের কাছে আসতেই দুই জন মোটরসাইকেলে করে এসে জিল্লুরের পথ রোধ করে। ধারলো অস্ত্র দেখিয়ে তারা জিল্লুরের হাত থেকে টাকার ব্যাগ কেড়ে নিয়ে পালিয়ে যায়।
আরিফ ইন্টারন্যাশনালের কর্মচারী জিল্লুর রহমান বলেন, মসজিদের ঐ দিকে যাওয়ার সময় পেছন থেকে দুজন মোটরসাইকেল নিয়ে আসে। তাদের মধ্যে একজন সামনে গিয়ে থামে। এরপর ধারলো অস্ত্র দেখিয়ে হাতে থাকা টাকার ব্যাগ কেড়ে নিয়ে চলে যায়। আমার কাছে যে টাকা আছে, সেটা তো ওদের জানার কথা না। নিশ্চই আগে থেকে টার্গেট করছিল তারা।
ঘটনার দিনের সিসিটিভি ফুটেজের বরাত দিয়ে ডিবি জানায়, ২৩ মে সন্ধ্যা থেকেই জিল্লুরকে অনুসরণ করেছিল সন্দেহভাজন দুজন। তারা আরিফ ইন্টারন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানের আশপাশে ঘোরাফেরা করছিল। রাত পৌনে ৯টার দিকে জিল্লুর প্রতিষ্ঠান থেকে বের হলে তারা তাকে অনুসরণ করে। বাড্ডার ছয়তলা মসজিদের কাছ থেকে ছিনতাই মিশন শেষ হওয়ার পর চার যুবক যায় নিকেতনের একটি বাসায়। ঐ বাসা যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিলকি হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত প্রধান আসামি সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চলের। চঞ্চল বর্তমানে আমেরিকায় আত্মগোপন করে আছেন। ঐ চার যুবক বাড়ির ছাদে যায়। সেখানে ১৫ লাখ টাকা নিয়ে খালি ব্যাগটি ফেলে রাখে। এর পরই ডিবি পুলিশ ঐ চার জনকে গ্রেপ্তার করে।
নিকেতনে চঞ্চলের বাড়ির সিকিউরিটি গার্ড ডিবিকে জানায়, ২৩ মে রাত ১০টার দিকে চঞ্চল সাহেবের ছেলের বন্ধুরা ঐ বাসায় এসেছিল। তারা বাসায় এসে ছাদে যায়। পরে ডিবি পুলিশ ঐ বাড়ির সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ থেকে ছিনতাইয়ে জড়িত ঐ চার যুবককে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে।
এদিকে গোয়েন্দারা বলছেন, রাজধানীর গুলশান, বনানী, রামপুরা, তেজগাঁও ও বাড্ডায় চঞ্চল ছাড়াও চাঁদাবাজিতে সক্রিয় শীর্ষ সন্ত্রাসী মেহেদী, আশিক, ডালিম ও রবিন। এদের মধ্যে মেহেদি আমেরিকায়, আশিক ভারতে এবং ডালিম-রবিন মালয়েশিয়ায় আত্মগোপন করেছেন। সেখান থেকেই তারা চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন। এদের মধ্যে মেহেদি বাড্ডার আওয়ামী লীগ নেতা ফরহাদ হত্যার চার্জশিটভুক্ত আসামি। আশিক কাওরান বাজারে ট্রিপল মার্ডারের চার্জশিটভুক্ত প্রধান আসামি। আর ডালিম-রবিন গুলশান ও তেজগাঁও এলাকায় চাঁদাবাজির ঘটনায় বেশ কয়েকটি মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, সন্ত্রাসী কার্যক্রম থেকে পাওয়া অর্থের একটা বড় অংশ পৃষ্ঠপোষকদের পকেটে যায়। তখন এ ধরনের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কিছু লোক দেখানো আইনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও তারা সব সময় আইনের ঊর্ধ্বে থেকে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।