৪০তম বিসিএসে নন-ক্যাডার থেকে প্রথম শ্রেণির (গ্রেড-৯) সহকারী প্রকৌশলীর শূন্য পদে ১৫৬ জনের নিয়োগ দিতে বলে এখন আবার জ্যেষ্ঠতার দোহায় দিয়ে বাতিল চাচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রকৗশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি)। চূড়ান্ত নিয়োগের সুপারিশের আগমুহূর্তে নিয়োগ বাতিলের আবেদনে বিপাকে পড়েছে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। কেননা ৪০তম বিসিএসের নন-ক্যাডারের যে তালিকা প্রকাশ করেছে, তাতে এসব পদও নির্বাচন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
অনেক প্রার্থী এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলীকে পছন্দক্রমে রেখে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। আবেদনের সময় শেষ হয়ে গেছে। এই সময় এসে এসব পদ বাতিলের আবেদনকে প্রহসন বলছেন নন-ক্যাডারের নিয়োগের অপেক্ষায় থাকা পরীক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, জ্যেষ্ঠতার যুক্তিতে রিকুইজিশন বাতিল করাটা অমানবিক ও অযৌক্তিক। প্রয়োজনে সমস্যা সমাধান করে হলেও ১৫৬টি পদের নিয়োগ বাতিল না করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা।
১৫৬ সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে পিএসসির চেয়ারম্যান সোহরাব হোসাইন বলেন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের চিঠি আমাদের নজরে এসেছে। কিন্তু এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আমাদের যা করতে বলবে, আমরা তাই করব। নিয়োগ কমানো বা বাড়ানো সরকারের এখতিয়ার। তবে এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত আসতে হবে, না হলে নন-ক্যাডার নিয়োগে দেরি হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দু’দফা ১৫৬ সহকারী প্রকৌশলী শূন্য পদের নিয়োগের চাহিদা দিয়েছিলো এলজিইডি। ২০২২ সালের ৩ আগস্ট স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ৪০ তম বিসিএস নন-ক্যাডার থেকে সুপারিশের জন্য সহকারী প্রকৌশলী(পুর) ১৫৬ পদের অধিচাযন পাঠান। গত বছরের ২৮ আগস্ট স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে শূন্য পদের তালিকা পিএসসিতে পাঠানো হয়। গত বছরের ২ নভেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এক চিঠিতে ১৫৬টি পদের অধিযাচন বাতিলের জন্য বলা হয়।
বাতিলের কারণ হিসেবে বলা হয় ভবিষ্যতে জোষ্ঠতার সমস্যা তৈরি হতে পারে। তবে জনবলের চাহিদা থাকায় গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর জ্যেষ্ঠতার বিষয় নিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করে আবারও ১৫৬ পদের চাহিদা পাঠায় স্থানীয় সরকার বিভাগে। চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি অধিযাচনের চিঠি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় হয়ে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি পিএসসিতে আসে।
গত ১৯ জুন নন-ক্যাডার পছন্দক্রমের জন্য আবেদন আহ্বান করে পিএসসি। কিন্তু ওইদিনেই প্রধান প্রকৌশলী আবার ১৫৬ পদের অধিযাচন বাতিল চেয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগে চিঠি দেন। গত ২৬ জুন স্থানীয় সরকার বিভাগ অধিচাযন বাতিলের চিঠি দেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী উল্লেখ করেন, ৪০তম বিসিএস থেকে এই ১৫৬ জন প্রকৗশলী নিয়োগ দিলে ‘ইতিপূর্বে সরাসরি নিয়োগকৃত ২৬৭ জন প্রকৌশলী, যাদের চাকরিকাল ইতিমধ্যে ২ বছরের বেশি অতিবাহিত হয়েছে, তারা জুনিয়র হিসেবে বিবেচিত হবেন (নন-ক্যাডার পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা বিধিমালা-২০১১-এর-৪(১) (ক) মোতাবেক)। এতে প্রশাসনিকসহ জ্যেষ্ঠতা তালিকা নিয়ে ভবিষ্যতে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।’ অর্থাৎ ২৬৭ জন প্রকৌশলী যারা ইতিপূর্বে পিএসসির সার্কুলারের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছিলেন, তাদের সার্কুলারের তারিখ ৪০তম বিসিএস সার্কুলারের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তারিখের পর হওয়ায় বিধিমালা অনুযায়ী আগে যাদের সার্কুলার,তাঁরা জ্যেষ্ঠতা পাবেন। অর্থাৎ এই নিয়োগ হলে ৪০তম বিসিএসের নন-ক্যাডার থেকে নিয়োগ পেতে যাওয়া ১৫৬ জন ইতিপূর্বে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া ২৬৭ জনের ওপর জ্যেষ্ঠতা পাবেন, যদিও ২৬৭ জনের চাকরিকাল প্রায় ২ বছর।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২১ সালের ৮ মার্চ একপত্রে বিসিএস নন-ক্যাডার এবং সরাসরি উন্মুক্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের জোষ্ঠতা সংক্রান্ত সৃষ্টি সমাধান জনপ্রশাসন থেকে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে ৪০ তম বিসিএস নন-ক্যাডার থেকে সহকারী প্রকৌশলী(পুর) পদের অধিযাচন নিয়ে সৃষ্ট জ্যেষ্ঠতার সমস্যার সমাধান করে এই পরিপত্রটি গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো হয়েছে। জনপ্রশাসনের এই স্মারক অনুসারের ৪০তম বিসিএসের নন-ক্যাডারের থেকে যোগদানকৃত প্রকৌশলীগন পূর্বে যোগদানকৃত প্রকৌশলী গণের থেকে জুনিয়র হবেন। এই পরিপত্রের বিষয়টি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে, স্থানীয় সরকার বিভাগ, জনপ্রশাসন সকলেই অবগত থাকলেও ২৬৭ সহকারী প্রকৌশলীর চাপে নতুন নিয়োগ বাতিল করার পায়তাঁরা চলছে।
নন-ক্যাডার প্রার্থীরা বলছেন, নিয়োগে সমস্যা থাকলে বিধিমালা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন, তা না করে নিরাপরাধদের কেন বলি দিচ্ছেন! প্রার্থীরা আরও বলছেন, সবচেয়ে বড় বিষয় ৪০তম বিসিএস অনেক প্রকৗশলীর শেষ পরীক্ষা ছিল। তাদের বয়স শেষ। তারা আর সরকারি চাকরিই পাবেন না, তারা জ্যেষ্ঠতার বিষয়টা জানেনই না, চিন্তাই করছেন না, চাকরি পাওয়াই তাদের কাছে এখন মুখ্য। শুধু আগের গ্রুপকে সুবিধা দেওয়ার জন্য ১৫৬ জন ছেলেমেয়ের চাকরিটাই বাতিল করে দেবেন? এটা চরম অমানবিক। তাছাড়া ৪০তম বিসিএস নন-ক্যাডার থেকে নিয়োগ দিলে খুব দ্রুত অধিদপ্তর এই প্রকৌশলীদের সেবা পাবেন।
নতুন সার্কুলার দিয়ে জনবল নিয়োগ দিতে দেড় থেকে দুই বছর লেগে যাবে। এ ছাড়া অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আউটসোর্সিং পদে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। দ্রুত নিয়োগ দিয়ে লোকবলসংকট নিরসন না করে সংকট বজায় রেখে আউটসোর্সিং পদে অস্থায়ী প্রকৌশলী নিয়োগ দেয়ার এই নোংরা কৌশল বন্ধ করতে হবে। আউটসোর্সিং নীতিমালা-২০১৮ অনুযায়ী, টেকনিক্যাল ডিপার্টমেন্টের টেকনিক্যাল পদে বা বিদ্যমান মূল রাজস্ব পদের প্যারালাল পদে নিয়োগ দেওয়ার বিধান নেই, শুধু অগুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার বিধান আছে। কিন্তু এখানে নীতিমালা অনুযায়ী যথাযথভাবে সার্কুলার প্রকাশ না করে, যথাযথ পরীক্ষা না নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পে অস্থায়ী পদ সৃষ্টি করে বিএসসি প্রকৌশলীদের বিশেষ সেবা-১ ও ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের বিশেষ সেবা-২ নামে আউটসোর্সিং পদে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে এবং তাদের আউটসোর্সিং সহকারী প্রকৗশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলী পরিচয়ে অধিদপ্তরের মধ্যে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিচিত করানো হচ্ছে।