বাসগৃহে পানির সংস্থান না থাকা প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে সাতটিতে পানি সংগ্রহ করে নারীরা। ঘরে খাবার পানি এবং স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) পরিষেবায় লিঙ্গবৈষম্যের বিষয়ে প্রথম বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ইউনিসেফ ও ডব্লিউএইচও প্রকাশিত নতুন এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। তথ্যানুসারে, বিশ্বব্যাপী নিজের পরিবারের জন্য পানি সংগ্রহের কাজটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীরাই করে থাকেন, যেখানে এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে মেয়েদের সংখ্যা ছেলেদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ এবং প্রতিদিন এই কাজের পেছনেই তাদের অনেক সময় ব্যয় হয়। ‘পরিবারের খাবার পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) বিষয়ে ২০০০-২০২২ পর্যন্ত অগ্রগতি :লিঙ্গভিত্তিক বিশেষ দৃষ্টি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ‘ওয়াশ’ পরিষেবায় লিঙ্গবৈষম্যের বিষয়ে প্রথম বারের মতো গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরে। পাশাপাশি উল্লেখ করে যে, নারী ও মেয়েরা বাড়ির বাইরে টয়লেট ব্যবহার করার সময় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনিরাপদ বোধ করেন ও স্বাস্থ্যবিধির ঘাটতির প্রভাব ও বৈষম্য অনুধাবন করে।
ইউনিসেফের ‘ওয়াশ’ ও ‘সিড’বিষয়ক পরিচালক সিসিলিয়া শার্প এ বিষয়ে বলেন, পানি সংগ্রহের জন্য একটি মেয়ের একটি করে ধাপ এগিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো পড়াশোনা, খেলাধুলা ও নিরাপত্তা থেকে তার একটি করে ধাপ দূরে সরে যাওয়া। অনিরাপদ পানি, অনিরাপদ টয়লেট ও বাড়িতে হাত ধোয়ার অনিরাপদ ব্যবস্থা মেয়েদের কাছ থেকে তাদের সম্ভাবনা কেড়ে নেয়, তাদের সার্বিক কল্যাণকে ঝুঁকিতে ফেলে এবং দারিদ্র্যের চক্রকে স্থায়ী করে। ‘ওয়াশ’ কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মেয়েদের চাহিদার প্রতি সাড়া প্রদানের বিষয়টি সর্বজনীন পানি ও স্যানিটেশন পরিষেবা নিশ্চিত করা এবং লিঙ্গ সমতা ও ক্ষমতায়ন অর্জনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ১৮০ কোটি মানুষ এমন ঘরবাড়িতে বসবাস করে যেখানে বাসগৃহে পানির সংস্থান নেই। ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীরা প্রাথমিকভাবে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীদের পানি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয়, যা তাদের পড়াশোনা, কাজ ও অবসর যাপনের সময় কমিয়ে দেয় এবং পথে তাদের শারীরিক আঘাত পাওয়া ও বিপদে পড়ার ঝুঁকিতে ফেলে।
প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে যে, ৫০ কোটির বেশি মানুষ এখনো অন্য পরিবারের সঙ্গে স্যানিটেশন সুবিধা ভাগাভাগি করে, যা নারীদের গোপনীয়তা, মর্যাদা এবং নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে। এছাড়াও অপর্যাপ্ত ‘ওয়াশ’ পরিষেবা নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় এবং নিরাপদে ও ব্যক্তিগতভাবে তাদের মাসিক ব্যবস্থাপনার সামর্থ্যকে সীমিত করে। উপাত্ত পাওয়া যায় এমন ৫১টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের নারী ও কিশোরী এবং যারা শারীরিকভাবে অক্ষম তাদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শারীরিক পরিচ্ছন্নতা ও পোশাক বদলের জন্য ব্যক্তিগত গোপনীয় স্থান থাকে না।
ডব্লিউএইচওর পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ড. মারিয়া নেইরা বলেন, ডব্লিউএইচওর সাম্প্রতিক তথ্য একটি কঠোর বাস্তবতা তুলে ধরে অপর্যাপ্ত পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির কারণে প্রতি বছর ১৪ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। নারীরা ডায়রিয়া ও তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের মতো শুধু ‘ওয়াশ’ সম্পর্কিত সংক্রামক রোগের সম্মুখীন হয় না, তারা এর বাইরেও বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হয়। কারণ যখন পানি সংগ্রহ বা শুধু টয়লেট ব্যবহার করার জন্য তাদের বাড়ির বাইরে যেতে হয়, তখন তারা হয়রানি, সহিংসতা ও আঘাতের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
প্রতিবেদনে উঠে আসা বিষয়গুলো দেখায় যে, স্বাস্থ্যবিধির অভাবও নারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করে। অনেক দেশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, খাবার রান্না করা এবং অসুস্থদের দেখাশোনা করাসহ ঘরের কাজ ও অন্যদের যত্ন নেওয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে নারীরাই দায়বদ্ধ থাকে। এটি অনেক ক্ষেত্রে তাদেরকে রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলে। হাত ধোয়াজনিত সুরক্ষার অভাবও তাদেরকে অন্যান্য স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির মুখে ফেলে। গৃহস্থালি কাজে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা হলে তা মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনা শেষ করার এবং কর্মসংস্থান লাভের সম্ভাবনাকেও সীমিত করতে পারে।