মানুষ সুদিনের অপেক্ষায় থাকে। আশায় থাকে উন্নত ভবিষ্যতের; কিন্তু গত কিছু দিন ধরিয়া যাহা হইতেছে—তাহাকে এক বাক্যে বলিলে ‘যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ।’ আজকের দিনটিকে খারাপ বলিয়া মনে হইলেও আগামীকালটা আজকের তুলনায় আরো খারাপ হইতেছে। সুতরাং সেই তুলনায় আজকের দিনটা কালকের তুলনায় অবশ্যই ভালো বটে। যদিও তাহা সংকটে পরিপূর্ণ। সংকটের স্কন্ধে চাপিতেছে নূতন নূতন সংকট। এই পরিস্থিতিতে অনেকের চোখেই ঘুম নাই। মানুষ না খাইয়া কিংবা আধপেটা খাইয়া দিন পার করিতেছে। যাহাদের অবস্থা সঙ্গিন, তাহাদের চোখে ‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু’ ভাবিতে ভাবিতে নিদ্রা জাঁকিয়া বসিতেও পারে; কিন্তু যাহারা ম্যানেজমেন্টে রহিয়াছেন, যাহাদের স্কন্ধে শতসহস্র মানুষের রুটিরুজির দায়িত্ব রহিয়াছে—তাহাদের চক্ষু হইতে নিদ্রা তিরোহিত হইয়া গিয়াছে। তাহাদের বিলাসিতা করিয়া বলিবার উপায় নাই—‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু’। সংশপ্তকের মতো তাহাদের যুঝিয়া যাইতে হইতেছে। এই ম্যানেজমেন্টের লোকজন বুঝিতেছেন—পরিস্থিতি কতখানি ঘোলাটে হইতেছে ক্রমশ। তাহার উপর তৃতীয় বিশ্বের কোনো কোনো দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতাও নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া বৃদ্ধি পাইতেছে।
বর্তমানে জিডিপি বৃদ্ধির হার ক্রমাগত কমিতেছে বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার পদধ্বনি শোনা যাইতেছে বেশ কয়েক মাস ধরিয়াই। বৈশ্বিক মন্দা ঘটিলে তাহার প্রভাব পড়ে বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই। সবচাইতে অধিক প্রভাব পড়ে জীবিকার উপর। মানুষের জীবন যেমন অমূল্য, তেমনি তাহার বাঁচিয়া থাকিবার জন্য ন্যূনতম কাজের নিশ্চয়তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। মহামূল্যবান জীবনকে রক্ষা করিতে জীবিকাই একমাত্র অক্সিজেন। সেই অক্সিজেন ছাড়া বাঁচিবে না জীবন। আমরা ৪৩-এর মন্বন্তরের কথা শুনিয়াছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নৃশংসতা ও দুর্ভোগের কথা শুনিয়াছি, ত্রিশের মহামন্দার কথা শুনিয়াছি—কিন্তু দেখি নাই। সুতরাং এখন যাহা হইতে যাইতেছে তাহা আমাদের নিকট সম্পূর্ণ নূতন অভিজ্ঞতা। এমনিতেই দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী। খাদ্য মূল্যস্ফীতি সবচাইতে অধিক। দেশে দেশে গরিব মানুষ হইতেছে অতি গরিব। অগণিত মানুষ চলিয়া যাইতেছে দারিদ্র্যসীমার নিচে। ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা ইতিমধ্যে নানা সংকেত দিতেছেন। এমনিতেই আন্তর্জাতিক বাজার টালমাটাল। তাহার উপর গ্যাস-বিদ্যুতের অভাব ব্যবসায়কে অনিশ্চিত করিয়া তুলিতেছে। এই অবস্থায় কোনো দেশ যদি স্বাভাবিক সময়ের মতো গতানুগতিক ম্যানেজমেন্ট দ্বারা পরিচালিত হয়, তাহা হইলে তাহা চলমান সমস্যা ও আসন্ন বিপর্যয়কর পরিস্থিতিকে আরো জটিল করিতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকিলে অদূর ভবিষ্যতে টানেলের শেষ প্রান্তেও আলোর দেখা মিলিবে না। সুতরাং বিশেষ ব্যবস্থাপনার হালনাগাদ সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়নে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিতে হইবে। এই জন্যই স্ব স্ব ক্ষেত্রে যাহারা ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে রহিয়াছেন—তাহারা কি সার্বিক পরিস্থিতি বুঝিতে পারিতেছেন না? বুঝিতে পারিলে তাহাদের চোখে নিদ্রা আসিবার কথা নহে। ইহা এক অতি কঠিন পরিস্থিতি, কঠিন পরীক্ষা। আর সকল পরিস্থিতি মিলিয়াই ঘোলা হইতেছে সুস্থির পানি। পানি ঘোলা হইলে যাহা হয় আর কি—ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে নামিয়া পড়ে মতলববাজরা। আমরা চারিদিকে সেই সকল মতলববাজকেও দেখিতেছি। সুতরাং এখন আরো অধিক সতর্ক হইতে হইবে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে।
মনে রাখিতে হইবে মহান আল্লাহতায়ালাহ যাহাকে খুশি তাহাকে সম্পদ দান করেন। আবার যে কাহারো নিকট হইতে সম্পদ কাড়িয়া লইতে পারেন। আবার সংকুচিতও করিতে পারেন। তিনিই মানুষকে সম্মানিত করেন আবার তিনিই অসম্মানিত করেন। আসলে মহারব মানুষকে নানানভাবে পরীক্ষায় ফেলিবেনই। এই অবস্থায় আমাদের ঠান্ডা মাথায় ধৈর্য ধারণ করিতে হইবে। কারণ, সৃষ্টিকর্তা ধৈর্যশীলদের পছন্দ করেন। যাহারা ধৈর্যশীল তাহাদের জন্য সুসংবাদ আসিবেই।