বসুন্ধরায় বিষক্রিয়ায় দুই শিশুর মৃত্যু

প্রতিষ্ঠানটির ছিল না অনুমোদন, রাসায়নিক প্রয়োগে কর্মীরা অজ্ঞ

কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই চলছিল রাজধানীর বারিধারার ডিসিএস অর্গানাইজেশন নামে পেস্ট কন্ট্রোল (বালাইনাশক) প্রতিষ্ঠানটি। এর চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফরহাদুল আমিন। বাসা, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানে কীটপতঙ্গ সমূলে উৎপাটন করা হয়—এরকম গ্যারান্টি দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন প্রচার করে প্রতিষ্ঠানটি। অনলাইনে তাদের কাছে কাজের অর্ডার আসে। এরপর তাদের কর্মচারীরা এলুমিনিয়াম ফসফাইড ট্যাবলেট (গ্যাস ট্যাবলেড) দিয়ে কীটপতঙ্গ বিনাশ করে। সাধারণত ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটের জন্য গড়ে ১৫ হাজার টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা নিত। এভাবেই চলছিল ডিসিএস অর্গানাইজেশনের পেস্ট কন্ট্রোলের কাজ।

গত ৪ জুন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন তুষারের নতুন ফ্ল্যাটে তেলাপোকা নিধনের জন্য গ্যাস ট্যাবলেট ব্যবহার করায় বিষক্রিয়ায় দুই ছেলে শায়ান মোবারত (১৫) ও শাহির মোবারত (১০) মারা যায়। ঐ ঘটনায় মোবারক হোসেন বাদী হয়ে ভাটারা থানায় ডিসিএস অর্গানাইজেশনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ঐ মামলায় পুলিশ প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান, এমডি ও টেকনিশিয়ানকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়।

ভাটারা থানার ওসি এ বি এম আসাদুজ্জামান জানান, ডিসিএস অর্গানাইজেশনের পেস্ট কন্ট্রোলের বিষয়ে কোনো অনুমোদন নেই। বিনা লাইসেন্সে প্রতিষ্ঠানটি কয়েক বছর ধরে ব্যবসা করছিল। প্রতিষ্ঠানটিতে টেকনিশিয়ান নিয়োগ করা হয়নি। নেই কোনো চিকিত্সক। এমনকি সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কোনো অনুমোদন ছিল না।

গ্রেফতারকৃতদের রিমান্ডে নিয়ে পাওয়া তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ভাটারা থানার ওসি বলেন, আমরা কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্ভিদ সংরক্ষণ বিভাগের খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি যে, এলুমিনিয়াম ফসফাইড বা গ্যাস ট্যাবলেট বাসাবাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারের কোনো নিয়ম নেই। খাদ্য গোডাউন বা ফসলের মাঠে এই গ্যাস ট্যাবলেট ব্যবহার করা হয়। বাসাবাড়িতে বিভিন্ন ধরনের তরল রাসায়নিক স্প্রে করতে হয়। নির্দিষ্ট মাত্রার রাসায়নিক মিশ্রণে তরল তৈরি করার নিয়ম রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা তাদের অজ্ঞতার কথা স্বীকার করেছেন। এ জন্য এই মামলায় তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ৩০৪-এর ক ধারায় অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যুর অভিযোগ আনা হচ্ছে।

ওসি আরো বলেন, ঈদের কয়েক দিন আগে মামলাটির তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে স্থানান্তর করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত তিন আসামিকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের খামারবাড়িতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠান, ফসলের মাঠ ও শস্যের আড়ত বা খাদ্যগুদামে পেস্ট কন্ট্রোলের জন্য উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বাড়ি, প্রতিষ্ঠান, ফসলের মাঠ ও শস্যের আড়ত বা খাদ্যগুদামে পেস্টিসাইড (বালাইনাশক) করার জন্য ১১৮টি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দিয়েছে উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখা। এই লাইসেন্স পেতে হলে ১৬টি শর্ত পালন করতে হয়। শর্তগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ঐ প্রতিষ্ঠানে এক জন চিকিত্সক নিয়োগ দিতে হবে। থাকতে হবে এক জন সার্টিফিকেটধারী টেকনিশিয়ান। প্রতিষ্ঠানটিতে কেমিক্যাল রাখার জন্য ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন নিতে হবে। যাদের নিয়োগ দেওয়া হবে, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র আবেদনপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অনাপত্তিপত্রও জমা দিতে হবে। শর্তগুলো পূরণ না করায় এ পর্যন্ত সাত শতাধিক আবেদনের কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

এদিকে, সারা দেশে হাজার হাজার পেস্ট কন্ট্রোলারের নামে পেস্টিসাইডের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগেরই নেই কোনো ঠিকানা। সোশ্যাল মিডিয়ায় অথবা রাস্তার ধারে সাইনবোর্ড টানিয়ে বা দেওয়ালে দেওয়ালে মোবাইল নম্বর দিয়ে পেস্ট কন্ট্রোলের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসায় কীটনাশক প্রয়োগে বিষক্রিয়ায় দুই শিশুর মৃত্যুর পর উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখা সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রচারণা চালাচ্ছে। অনুমোদনবিহীন পেস্ট কন্ট্রোলের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা চেয়েছে।