বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য ‘জনসংখ্যা’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। দেশটির আয়তন, ভৌগোলিক অবস্থা বা অবস্থান, সুস্থ কিংবা অসুস্থ, শিক্ষিত বা অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী—এই সব বিচারেই ‘জনসংখ্যা’ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের জনগণ তথা সাধারণ গণমানুষ দেশটির প্রধান চালিকাশক্তি বা প্রাণশক্তি। আর সে প্রাণের প্রকাশ বা স্পন্দন মনোরম হতে পারে যদি মানুষ সাধারণ খাদ্যে-স্বাস্থ্যে-শিক্ষায় সবল ও কর্মক্ষম থাকে। সমৃদ্ধ একটি দেশ নির্মাণ তাহলেই সম্ভবপর হয়।
আমাদের আয়তন সীমিত, আমাদের উৎপাদন সীমিত। সে হিসেবে আমাদের দরকার জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষা করা। গত আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা সাড়ে ১৬ কোটিরও বেশি। এযাবত্কালের পরিসংখ্যান মতে, আমাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার (টিএফআর) ২ দশমিক ০৪। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ২-এর মধ্যে অনাটা জরুরি। পরিবারে সদস্যসংখ্যা যদি সীমিত থাকে, তাহলেই সেখানে যথাযথ পুষ্টি, শিক্ষা-সংস্কৃতি তথা চেতনার বিকাশ সম্ভবপর হয়। নৈতিক চেতনাবোধ জাগ্রত করা সম্ভব হয়। নীতি-নৈতিকতা তথা সংস্কৃতির চেতনাবিকাশ ছাড়া কোনো জাতি দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। দেশ স্বাধীনের পরপর যে একটা উন্মাদনা নিয়ে শুরু হয়েছিল আমাদের যাত্রা, শিক্ষা-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বাঙালির দৃপ্ত পদচারণা—আবার যদি সেভাবেই উদ্দীপিত হওয়া যেত! আমরা আমাদের মুক্তির ঋণ, স্বাধীনতার শপথ সবটা রক্ষা করতে পারিনি! অনেক সময়ই বিভেদ-বৈষম্যের পথে হেঁটেছি। ব্যক্তিগত লোভ-লালসায় উন্মত্ত হয়ে জনমানুষের মঙ্গলের পথ থেকে দূরে সরে গেছি!
রাষ্ট্র চাইলে কী না সম্ভব? আমাদের রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে প্রশাসক-প্রশাসনের প্রতিটি কর্তাব্যক্তি, কর্মকর্তা-ডাক্তার, নন ডাক্তার-পেশাজীবী সবাই যদি একজোট হয়ে জাতির মঙ্গলে কাজ করেন, তাহলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। আমাদের প্রয়োজন, সবল দক্ষ জনবল গড়ে তুলে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের পথে এগিয়ে যাওয়া। মা ও শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, কিশোর-কিশোরীর স্বাস্থ্যশিক্ষার উন্নয়ন ঘটানো এবং একটি দক্ষ জনবল বা যুবশক্তি গড়ে তোলা আমাদের কর্তব্য। শিক্ষিত-দক্ষ যুবশক্তি দেশমাতৃকার রক্ষাকবচ। স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির পথ পরিহার করে যুবসমাজকে তার মেধা বিকাশের সুযোগ করে দেওয়াও দরকার।
বাল্যবিবাহ এখনো আমাদের একটা অভিশাপের মতো। এই সময়েও দেশে প্রায় ৫০ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় অপরিণত বয়সে, কৈশোরকালীন—প্রসূতিমৃত্যু এবং শিশুমৃত্যুর যা অন্যতম কারণ। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে এই মৃত্যুরোধ করতে হবে, মা ও শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। মায়ের গর্ভকালীন, প্রসবকালীন, প্রসব-পরবর্তী স্বাস্থ্য ও পুষ্টি এবং পরিবার পরিকল্পনাসেবা নিতে হবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। বাড়িতে ডেলিভারি নিরুত্সাহিত করে শতভাগ প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি নিশ্চিত করতে হবে। মায়েদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসতে বলতে হবে। আমরা যারা স্বাস্থ্যকর্মী আছি, আমাদের সিটে থেকে আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা দিতে হবে। তাহলেই তারা আমাদের ওপর আস্থা পাবেন। মায়েদের গর্ভকালীন চেকআপ, তাদের খাদ্য-পুষ্টি সম্পর্কে জ্ঞান, এমনকি দরকার হলে ‘গর্ভকালীন সেবায়’ এএনসিতে তাদের জন্য যদি পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করতে পারি (সপ্তাহে অন্তত এক দিন হলেও) মায়েরা আমাদের সেবাকেন্দ্রে আসবেন। আমাদের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে যদি আমরা এ রকম ইনিশিয়েটিভ নিতে পারি, তাহলে খুব ভালো হয়। এভাবেই গর্ভকালীন সেবা বাড়িয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে প্রসূতিমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু একদিন শূন্যে নেমে আসবে—এ আশা আমরা করতেই পারি।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের মাথার ওপরে আছেন। সরকার তার বাহুর মধ্য দিয়ে কাজ করছেন। তার অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে ‘অবাধ তথ্যপ্রবাহ’। তথ্য গোপন করা যাবে না। সরকারের যেসব সক্ষমতা আছে, জনমানুষকে আমাদেরই জানাতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রসহ উচ্চতর সব সেবাকেন্দ্র থেকে যেসব সেবা বিনা মূল্যে দেওয়া হয়, মানুষসাধারণকে জানাতে হবে। মনে রাখতে হবে, এসব মানুষের ট্যাক্সের টাকায় আমাদের বেতন হয়। আমাদের স্কুল কারিকুলামে প্রতিটি সরকারি প্রাইমারিতে যদি ‘মিড ডে মিল’ চালু করা যেত, পাঁচ বছর পর হলেও আমরা তার সুফল পেতাম। প্রতিটি শিশুর সঠিক খাদ্য এবং পুষ্টিই পারে সমৃদ্ধ একটি জাতি গড়তে। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের এই ক্ষণে প্রত্যাশা করি—প্রতিটি মা, প্রতিটি শিশুর সুষম পুষ্টি নিশ্চিত হবে এবং একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
লেখক : চিকিৎসক