নগরে যেন তিলধারণের ঠাঁই নেই! তার পরও উন্নত জীবনের আশায় প্রায় প্রতিদিনই গ্রাম থেকে শহরের দিকে ছুটছে মানুষ। শহরে এলেই কর্মসংস্থান হবে, রয়েছে উন্নত নাগরিক সেবা, বাড়বে জীবনযাত্রার মান—এই ধারণা নিয়েই মানুষ হচ্ছে শহরমুখী। অন্যদিকে গ্রামে দিনমজুরের অভাব প্রকট রূপ ধারণ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী ২০১৪ সালে গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষ প্রতি হাজারে ২৮ দশমিক ২ জন। ২০১৮ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩০ দশমিক ৬ জন। এইভাবে শহরমুখী প্রবণতা বাড়তে থাকায় শহরে সৃষ্টি হয়েছে এক অসহনীয় পরিস্থিতি। সরকারের সেবা খাত, যেমন—পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ এই সেবাগুলোও ব্যাহত হচ্ছে, গড়ে উঠছে অবৈধ স্থাপনা, অপরিকল্পিত কলকারখানা, বাড়ছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুনসহ নানা রকম অসামাজিক কাজকর্ম, গড়ে উঠছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বস্তি, দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, সৃষ্টি হচ্ছে বিভিন্ন রোগ, বাড়ছে যানজট, নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সময়।
এত এত অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও মানুষ শহরমুখী হচ্ছে । কারণ গ্রামে কর্মসংস্থানের অভাব এবং উন্নতসেবার অভাব। এই শহরমুখী প্রবণতা কমাতে গ্রামকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন তখনই সম্ভব হবে, যখন দেশের গ্রাম ও শহর একই সঙ্গে তাল মিলিয়ে অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেই গ্রামের সার্বিক ব্যবস্থা ও সেবার মান উন্নত হবে। এই প্রসঙ্গে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত একটি সুন্দর কথা বলেছেন, ‘শহরমুখী প্রবণতা বন্ধ করতে হলে বাংলাদেশের গ্রামগুলোকে সুইজারল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার গ্রামগুলোর মতো উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে হবে। সৃষ্টি করতে হবে সব ধরনের নাগরিক সুবিধামতো গ্রামীণ জনপদ।’
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। গ্রামে রয়েছে অসংখ্য কৃষিজমি। কিন্তু তা চাষের জন্য নেই আধুনিক যন্ত্রপাতি। তাই কৃষি খাতকে আধুনিক করে কৃষিতে তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে। বাড়াতে হবে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান, যার ফলে বাড়বে জীবনযাত্রার মান। গ্রামের হস্ত ও তাঁতচালিত কুটিরশিল্পগুলোকে করতে হবে আধুনিক। বিভিন্ন অবকাঠামো, কলকারখানা, পোশাক কারখানা এই শিল্পগুলো গ্রামের দিকে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের পোশাকশিল্পে অধিকাংশ নারী। তারা গ্রাম থেকে এসে শহরে কাজ করেন। তাই এই শিল্পগুলো গ্রামের দিকে গড়ে তুললে তারা শহরে আসবেন না। যার ফলে কম দামে পাওয়া যাবে শ্রমিক, গ্রামের দিকে বৃদ্ধি পাবে জমির মূল্য, নতুন উদ্যোক্তারা অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রামের দিকে উন্নয়নমূলক কাজগুলো করার অনুপ্রেরণা পাবেন। এতে করে বৃদ্ধি পাবে গ্রামীণ উন্নয়ন।
একই সঙ্গে উন্নত করতে হবে গ্রামের চিকিত্সাব্যবস্থা। আধুনিক করতে হবে গ্রামের হাসপাতালগুলো, সহজ করতে হবে রোগ নির্ণয় করার আধুনিক যন্ত্রপাতিগুলো। যার ফলে চিকিৎসার জন্য ছুটে আসতে হবে না শহরে।
গ্রামে শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষা যেন বিভাগীয় শহরে গিয়ে না দিতে হয়, সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে যেন শিক্ষার জন্য শহরমুখী হতে না হয়। পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ এই সেবাগুলো গ্রামে নিরবচ্ছিন্ন করতে হবে। হাঁস, মুরগি ও পশুপালনের যথেষ্ট সুবিধা রয়েছে গ্রামে। তাই বিভিন্ন রকম খামার প্রকল্প করার পরিকল্পনা গড়ে তুলতে হবে গ্রামে। শহরমুখী প্রবণতা কমাতে বাংলাদেশ সরকার গৃহায়ন প্রকল্প, ঘরে ফেরা কর্মসূচি, ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প ইত্যাদি বাস্তবায়ন করছে এবং গ্রামীণ উন্নয়নে বিভিন্ন রকম কাজ করছে। এগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন হলে শহরমুখী প্রবণতা কমে আসবে বলে আশা করা যায়।
লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়