ত্যাগ উপভোগ!

ভোগ থেকে উপভোগ। ত্যাগ করেও যে ভোগ উপভোগ করা যায়, তার বিরল দৃষ্টান্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি যেন একটি ত্যাগী জীবন উপভোগের কথিকা, গল্প, সাহিত্য। ছোট ছোট বাক্যে মুনশিয়ানাপূর্ণ হাতের লেখা। প্রতিটি শব্দই একেকটি মেসেজ। মানুষ, দেশ ও মাটিকে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখার সাবলীল পঙিক্তমালা। চলার পথ কাহিনি।

কোনো রকম পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই লেখাগুলো বর্ণিত হয়েছে। তার অকপট ও খোলামেলা প্রেমপূর্ণ বিশাল দেহ ও আত্মার ত্যাগ উপভোগের অন্য নামই বাংলাদেশ। তিনি কোথাও লেখেন নাই যে, তিনি একক, একা বা তিনিই সব করেছেন। পেছনে থাকা রেণু যেন অতন্দ্র প্রহরী। এ যেন মুক্তির স্বাধীনতার উপভোগপত্র। তৃপ্তির আলেখ্য। মহানায়কের মহাকাব্য। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ের সম্পাদক তত্কন্যা শেখ হাসিনা যেন আটলান্টিক মহাসাগরের অতল গভীরতা তথা মনি ভাইয়ের দেরাজ থেকে পাওয়া মনিমুক্তাসম সম্পদ জনতার মাঠে হুবহু তুলে দিলেন। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা তার এই নিখুঁত ক্লেশহীন উপস্থাপনা ও প্রকাশনার জন্য।

যতই পড়ি শুধু লিখে রাখব, না কোন অংশ রেখে কোনটা বাদ দেব এ এক মহা ফাঁপড়ে পড়ে গেলাম। গভীরতায় এত দরদ যেন বঙ্গবন্ধু অদ্বিতীয় এক উপভোগ্য ত্যাগী বাদশা। সম্পূর্ণ বইটি যেন একটা মুক্তির-সত্যের উপভোগ্য ভ্রমণকাহিনি। আমি বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে হাসুর ছয় মাসের বড়। বঙ্গবন্ধু কলকাতার বেকার হোস্টেলের ২৪ নম্বর কক্ষে থাকতেন, ১৯৪৬-৪৭ সালে। ২০১৮-এর শেষ মাসে বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে কলকাতায় গেলে আমি বেকার হোস্টেলে তার কক্ষ, এখন যা জাদুঘর, তা স্বচক্ষে দেখে আপ্লুত। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালের ঘটনার কথা তেমন মনে নেই। তবে ৬ দফা, ১১ দফা, ৭ জুন, ১৯৬৯-এর গণ- অভ্যুত্থান, ১২ নভেম্বর ১৯৭০-এর ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস, ৭ই মার্চ, ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর ১৯৭৫-এর নৃশংস হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি সব ইতিহাসের প্রত্যক্ষ সাক্ষী আমরা। তাই বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ে ও সব জেনেশুনে অন্তর থেকে বলতে পারি যে—তিনি শুধু লিখেই যাননি, রেখে গেছেন শেখ হাসিনার খুঁজে পাওয়া এক অসমাপ্ত তৃষ্ণার্তের আত্মজীবনী। এ যেন বঙ্গবন্ধুর পরিশুদ্ধ এক ছন্দগদ্য। খুবই নিয়মতান্ত্রিক গঠনমূলক রচনা জীবন দিয়েই এঁকে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক, পারিবারিক দিগদর্শন, দূরদর্শিতা, চিন্তা-চেতনা সবকিছুই আয়নার মতো পরস্ফুটিত হয়ে আছে তার লেখায়।

ক্ষুদিরাম ফাঁসিকাষ্ঠে যেতে যেতে গাইছিলেন, ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’। ক্ষুদিরামের ত্যাগে উপভোগ ছিল কি না আমি জানি না। তবে জন্ম থেকে মৃত্যুক্ষণ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ত্যাগকে যে উপভোগ করেছেন, এটার প্রমাণ প্রতি শব্দে বাক্যে ও জীবনচরিতে পাওয়া যায়। এ এক অমূল্য জীবনদান উপভোগ। অসমাপ্ত আত্মজীবনী যখন একটানা এক ধ্যানে পড়া শেষ হলো, তখন বুক ধড়ফড় করা আরো বেড়ে গেল। এরপর আমাদের কী করতে হবে? আমাদের ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব কী? নেতাদের করণীয় কী? ইত্যাদি হাজারো প্রশ্ন জেগে উঠল মনে।

প্রশ্নগুলো মানসপটে যখন ভাসছে, তখনই হাতের কাছে পেয়ে গেলাম এর উত্তরসমূহ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সম্পাদিত আরেকটি অনবদ্য ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনক আমার নেতা আমার’ গ্রন্থালোকে স্মৃতির দখিন দুয়ার অধ্যায়ের ১৬৯-১৭০ পৃষ্ঠায় তিনি লেখেন, “আমাদের গ্রামের মেয়েরা সবচেয়ে বেশি পশ্চাৎপদ।...সামাজিক ক্ষেত্রে তারা নানারকম অনাচার-অবিচারের শিকার হয়ে থাকে। মেয়েরা সার্বজনীন শিক্ষার সুযোগ পেলে, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে দাঁড়ালে মননে-ব্যক্তিত্বে সাহসের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পেলে কোনো প্রকার নির্যাতন বা শোষণ তাদের অন্তরায় হয়ে থাকবে না। নিজের অধিকার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম মেয়েদেরই শক্ত হাতে নিতে হবে।

“...গ্রামের উন্নয়ন প্রক্রিয়া বলতে আমি কোনো ছিটাফোঁটা বা সাময়িক ব্যবস্থায় বিশ্বাসী নই। আমি কোনো অনুদানমূলক বা প্রতিশ্রুতিপূর্ণ উন্নয়ন নয়, ‘টোটাল’ বা ‘সামগ্রিক’ উন্নয়ন চাই।”

তার সরকার মানবসম্পদ উন্নয়নে ২০১৪-২০১৭ সাল পর্যন্ত মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় সমাপ্তকৃত মাতৃত্বকালীন ভাতাকেন্দ্রিক স্বপ্ন প্যাকেজ ১০ উপজেলায় পাইলট ও মডেল কর্মসূচি হিসেবে গণ্য হয়। ডরপ-এর বাস্তবায়ন সহযোগী সংস্থা ছিল। মহিলা অধিদপ্তর তথা মন্ত্রণালয় কর্তৃক তিন সদস্যবিশিষ্ট মূল্যায়ন কমিটি বিস্তারিত বর্ণনার শেষাংশে লেখেন, ‘স্বপ্ন প্যাকেজ’ কর্মসূচি যে উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা করেছিল তা সফল হয়েছে। ‘স্বপ্ন প্যাকেজ’ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের টেকসই উন্নয়নের একটি রোল মডেল।’ ফলে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে সক মায়ের একই ধ্বনি ‘যে মা পদ্মা সেতু করতে পারেন, সে মা স্বপ্ন মা-ও গড়তে পারেন।’ এ পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৩ মার্চ ২০২৩-এ অর্থ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোক্তা সংস্থা ইনফ্রাস্টাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি) সফল ১০ উপজেলাকে সার্কেল করে ৩০ উপজেলায় এর বাস্তবায়ন প্রস্তাব দাখিল করে। আমরা এখন এর অনুমোদন ও বাস্তবায়ন চাই। তাহলেই বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ উপভোগ ও তত্কন্যা মা-কুলের প্রতিনিধি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টোটাল উন্নয়ন চিন্তা চেতনার ভিত তৈরি হবে। ১ কোটি উন্নয়ন বটম লাইনিং মাতৃভাতাপ্রাপ্ত গরিব মাকে টার্গেট করে ২০ বছর এক প্রজন্ম মেয়াদে ‘স্বপ্ন প্যাকেজ’-এর মাধ্যমে এসডিজি এজেন্ডা এন্ডিং পোভার্টি বাস্তবায়ন হলে দেশে আর কেউ স্বাস্থ্যহীন, শিক্ষাহীন, ঘরহীন, কর্মসংস্থানহীন থাকবেন না।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা এরং সিইও, ডরপ