পাঁচ শ টাকার পুঁজিতে আত্মনির্ভরশীল পারুল

নারী সমাজের বোঝা নয়, কল্যাণের অগ্রযাত্রা ও আত্মনির্ভরশীল সৃষ্টি ও মমত্বের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ নারী। নারীকে অবজ্ঞা, উপেক্ষা ও ফেলে দেওয়ার নয়। দেশ জাতি ও সমাজ নির্মাণে এখন পুরুষের পাশাপাশি সমান তালে নারীরাও এগিয়ে চলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলায় পারুল আক্তার (৪০) অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী দেশসেরা পদকে ভূষিত হয়েছেন। মাত্র ৫০০ টাকা পুঁজি নিয়ে নার্সারি কাজ করে সংসার চালাতে শুরু করেন তিনি। নিজের দক্ষতা ও মেধা দিয়ে নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি শতাধিক নারী-পুরুষকে আত্মনির্ভরশীল ও স্বাবলম্বী করে তুলেছেন।

ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। এ প্রবাদবাক্যটি নিজের জীবনে যেমন বাস্তবায়ন করেছে তেমনি অন্যের জীবনের ভাগ্যের চাকাও বদলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন পারুল আক্তার। অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে তিনি আজ সফল উদ্যোক্তা। প্রতিদিন তার কাছে প্রশিক্ষণ নিতে আসছে এলাকার যুবক-যুবতিরা। তার কর্মকাণ্ডে মুগ্ধ হচ্ছেন সবাই। বাড়ছে তার নার্সারির চারা গাছের চাহিদা। গত ৯ মার্চ জাতীয় পর্যায়ে আত্মনির্ভরশীল নারী দিবসের সেমিনারে কর্মদক্ষতা পর্যবেক্ষণ ও আত্মনির্ভরশীল শ্রেষ্ঠ নারী হিসেবে পারুলকে স্বীকৃতি দেয় বাংলাদেশ সরকার এবং অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী দেশসেরা স্বীকৃতি ও জাতীয় পদক গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে।

উপজেলার নবীপুর পূর্ব ইউনিয়নের বাখরনগর গ্রামের কাউছার আলমের স্ত্রী পারুল আক্তার। ছোট একটি কুঁড়েঘরে বাস করতেন পারুল বেগম। ২২ বছর আগে বিয়ে হয়। ২ বছর পর কোল জুড়ে আসে একটি মেয়েসন্তান। বিয়ের পর থেকে স্বামী রিকশা চালিয়ে ছেলে-মেয়েদের দুই বেলা খাওয়ানোর মতো আয় হতো না। এতে সংসার ভালো চলছিল না। অন্যের বাড়িতে নিজে ঝিয়ের কাজ করে তিন সন্তানসহ পাঁচ জনের সংসার চালাতে খুব হিমশিম পেতে হতো। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে পারত না। এমনকি না খেয়ে কাটাতে হয়েছে দিনের পর দিন। এক সময় পরিকল্পনা করেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে।

যেই ভাবনা সেই কাজ। আত্মপ্রত্যয়ী পারুল শুরু করেন স্বপ্নের ফুল ফোটাতে। সে জন্য পুঁজি ও কারিগরি শিক্ষা দুটোরই প্রয়োজন। ৫০০ টাকা নিয়ে কিছু ফলের গাছ তৈরি করে বিক্রি শুরু করেন। পরে নার্সারি কাজের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শুরু হয় তার জীবনসংগ্রাম। পুঁজি আর জনবল নিয়ে ২০০৪ সালে ‘সবুজ নার্সারি’ নামে ক্ষুদ্র একটি নার্সারির যাত্রা শুরু করেন। নিজেকে আত্মনির্ভরশীল করতে তার বুদ্ধি, কর্মদক্ষতা ও মেধা দিয়ে সুদক্ষ হাতে শুরু হয় নার্সারি ব্যবসা। এই নার্সারি কাজ করে সংসার চালাতে শুরু করে পারুল। এতে করেই আস্তে আস্তে তার অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয়। বর্তমানে তিন বিঘা জমি নিয়ে চলছে তার নার্সারি। এখানে কি পাল, চেরি, মিরাক্কেল, এভিলিও, পাসিমন, অলিফ, কিউই, এডোকাডের মতো দেশি-বিদেশি শতাধিক জাতের চারা গাছ রয়েছে। এই নার্সারিতে দৈনিক ১৫ জন লোক কাজ করে। এখন মাসিক আয় ৭০/৮০ হাজার টাকা। সংসারের নেই আর কোনো প্রকার সমস্যা। এখন স্বামী সংসার নিয়ে অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জন করেছে পারুল। পাশাপাশি এলাকার শত শত দুস্থ লোককে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তার কাছে কাজ শিখে স্বাবলম্বী হয়েছেন অনেক নারী-পুরুষ। তবে গল্পটি যত সহজে বলা গেল বাস্তবতা অতটা মসৃণ ছিল না পারুলের জন্য।

পারুল আক্তার বলেন, নারী হিসেবে ব্যবসা করার বিষয়টি সমাজ খুব সহজভাবে মেনে নেয় না। তাও আবার গ্রামের মতো জায়গা। পরিবার থেকে সে সময় স্বামী আমার পাশে থাকায় আজ এ অবস্থায় আসতে পেরেছি। আমি কয়েক শতাধিক নারী-পুরুষকে            কাজ শিখিয়েছি। আজ অনেকে স্বাবলম্বী হয়েছেন। সরকার আমার মতো এক নারীকে দেশসেরা পদক দিয়ে নারী সমাজের সম্মান উজ্জ্বল করেছেন। পারুল আক্তার শুধু নিজের অবস্থানের পরিবর্তন করেই ক্ষান্ত নন, স্বপ্ন দেখেন অসহায় নারীদের পাশে দাঁড়ানোর। তিনি বলেছেন, ‘সংগ্রাম করে এ পর্যন্ত এসেছি। বাকি জীবনটাও সংগ্রাম করে কাটিয়ে দেব অসহায়দের পাশে থেকে।’

স্বামী আবু কাউছার বলেন, আমি স্বামী হিসেবে সংসারের দায়িত্ব নিতে পারিনি। আমার স্ত্রী পারুল নিজের কর্মদক্ষতায় আত্মনির্ভরশীল নারী হিসেবে দেশ ও এলাকার মান উজ্জ্বল করেছে। এজন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

মুরাদনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ড. আহসানুল আলম সরকার কিশোর বলেন, ‘সবুজ নার্সারির মাধ্যমে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা যুবক যুবতীদের এনে আত্মনির্ভরশীল করতে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যুবসমাজ স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি নিজের ও দেশের অর্থনৈতিকভাবে পরিবর্তনে বিপ্লব ঘটাচ্ছেন। পারুল আক্তার দেশসেরা নারী খেতাবে ভূষিত হয়ে   নারী সমাজকে জাগ্রতসহ মুরাদনগর উপজেলার মান উজ্জ্বল করেছেন।’