বনানীর ১১ নম্বর রোডে সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের (সাফ) অফিস। খুব সুন্দর অফিস সাজিয়েছেন সাফের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক হেলাল। ছিমছাম, গোছালো, শৃঙ্খলভাবে চলে, এই অফিস যেন তারই প্রতীক। দুপুরের আগেই সাফের অফিসে হাজির জাতীয় ফুটবল দলের গোলকিপার আনিসুর রহমান জিকো। সম্প্রতি ভারতের বেঙ্গলুরুতে অনুষ্ঠিত সাফের ১৪তম আসরে সেরা গোলকিপারের পুরস্কার পেয়েছেন জিকো। বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য এটা অনেক গৌরবের। সাফে আর কোনো গোলকিপার এই পুরস্কার পাননি।
আনোয়ারুল হক হেলালের সঙ্গে দেখা করেই আলোচনা। তারপরই ট্রফি তুলে দেওয়ার পর্ব। সোনালি ট্রফির দিকে তাকাতেই জিকোর চোখ হেসে উঠল। ঠোঁটে হাসি এক চিলতে হাসির রেখা। এ যেন অনেক সাধনায় পাওয়া ফসল। সাফের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক হেলাল নিজই ট্রফি তুলে দিলেন। ট্রফি নিয়ে জিকো মনে করলেন আর্জেন্টিনার গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজের কথা। মার্টিনেজ গোল্ডেন গ্লাভস পেয়েছিল বিশ্বকাপে।
সেমিফাইনালে দুর্ভাগ্যজনকভাবে কুয়েতের কাছে ১-০ গোলে হেরে ঢাকায় ফিরে এসেছিল বাংলাদেশ। ফাইনাল হয়েছে ৪ জুলাই। ফাইনালের মঞ্চে পুরস্কার নিতে পারেননি। তবে জিকোর জন্য যে ট্রফিটি প্রস্তুত রাখা হয়েছিল সেটির মান ভালো ছিল না। দেখতেও সুন্দর ছিল না। গ্রহণ করার মতো ট্রফি তৈরি করা হয়নি। আনোয়ারুল হক হেলারের পছন্দ হয়নি। বাধ্য হয়ে হেলাল ঢাকা থেকে একটা সুন্দর এবং সম্মানজনক ট্রফি বানিয়ে জিকোর হাতে তুলে দিয়ে শান্তি পেয়েছেন সাফের সম্পাদক, দেশের কিংবদন্তি ক্রীড়া সংগঠক আনোয়ারুল হক হেলাল।
উপমহাদেশের সেরা গোলকিপার হতে গিয়ে কত কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল চট্টগ্রামের চকোরিয়া দুলাহাজরার ছেলে জিকোকে। বাবা মঞ্জুর আলম, মা দিলদার বেগম। তিন বোন বড় ছোট এক ভাই। পরিবার থেকে সব সময় বাধা এসেছিল ফুটবল খেলা যাবে না। পরিবারের আপত্তি ফুটবলে ভবিষ্যত নেই। সবার বাঁধার মুখে নিরবে মুখ নিচু করে মনে মনে শপথ নিয়েছিলেন যেভাবেই হোক ফুটবল খেলবেন। দেশের জার্সি গায়ে খেলবেন। সাগর পাড়ে গিয়ে একা একা পায়চারি করেছেন, কতো বার সূর্য ডোবা দেখেছেন। মনে মনে ভাবতেন এভাবে নিজের স্বপ্নটাকে ডুবিয়ে দেবেন না। কীভাবে ঢাকায় আসা যায়। ফুটবলার হওয়া যায় সেই স্বপ্নটা দানা পাকাতো। বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে ঢাকায় এসেছিলেন জিকো। সেই জিকো এখন উপমহাদেশের গোলপোস্টের আস্থা। ভারত পাকিস্তান, মালদ্বীপ, নেপাল শুধু নয়। মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত দেখেছে, লেবানন দেখেছে জিকোর খেলা। তাদের বুকেও আছে জিকোর জন্য ভালোবাসা। এখন নিজের পরিবারও তাকে নিয়ে গর্ব করে। দুলাহাজরা এলাকার মানুষও গৌরববোধ করে।
ট্রফি হাতে সাফের অফিস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় একটা চাপা কষ্ট জিকোর বুকে অনুভূত হচ্ছিল বোধহয়। ট্রফিটা হাতে জিকো বলছিলেন কুয়েত ম্যাচে হারের দুঃখটা ভুলতে পারছি না। ফাইনালে উঠতে পারলে এই ট্রফিটা চ্যাম্পিয়ন ট্রফির মতোই লাগত।