বিলাঞ্চলে ভাসমান সবজি বেড তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন পিরোজপুরের নাজিরপুরের কৃষকরা। আষাঢ় মাসের পানির আসার সঙ্গে সঙ্গে যখন আশপাশের জমি তলিয়ে যায়, তখন সবজি চাষের জন্য এ ধরনের বেড তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন কৃষকরা। বর্তমানে উপজেলার কলারদোয়ানিয়া, পদ্মডুবি, মনোহরপুর, দেউলবাড়ী, সোনাপুর, বিলডুমরিয়াসহ বিভিন্ন বিলে কৃষকরা সবজি চাষের জন্য বেড তৈরি করছেন। এখানে উৎপাদিত সবজি নিয়েই বেঠাকাটা ঐতিহ্যবাহী ভাসমান সবজি বাজার বসে।
ভাসমান সবজি চাষি ফরিদ বালি জানান, কচুরিপানার ঘন, লম্বা ও পুরু স্তরের ওপর একটি নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের বাঁশ ফেলে এ বেড তৈরি করা হয়। এরপর বাঁশের ওপর দাঁড়িয়ে শরীরের ভারসাম্য ঠিক রেখে দুই পাশ থেকে কচুরিপানা টেনে এনে বাঁশের ওপর স্তরে স্তরে সাজাতে হয়। কচুরিপানার স্তর সাজানোর সময় কচুরিপানা পানিতে যেভাবে থাকে সেভাবে ঘন করে অর্থাত্ খাড়া করে সাজাতে হবে। পরবর্তী অর্ধেক স্তর সজানোর সময় কচুরিপানা উলটো করে সাজাতে হবে অর্থাৎ এর শিকড় ওপরের দিকে থাকতে হবে। তারপর পা দিয়ে চেপে চেপে উঁচু স্তর তৈরি করতে হবে যাতে কোন গ্যাপ বা ফাঁকা জায়গা না থাকে। এরপর স্তূপের ওপরে উঠে প্রয়োজনীয় কচুরিপানা তুলে মাপ অনুযায়ী ধাপ তৈরি করতে হবে। ধাপের ওপরের অংশে অপেক্ষাকৃত ছোট কচুরিপানা, খুদি পানা, টোপা পানা দেওয়া ভালো। বন্যা, ঢেউ বা জোয়ার-ভাটার স্রোত থাকলে বেডের মাঝামাঝি জায়গায় বাঁশের খুঁটি বা বেডের চারপাশে ফ্রেম দিতে হবে।
কৃষক হোসাইন মোল্লা জানান, ভাসমান বেড তৈরির পর উপরিভাগ আবাদ উপযোগী হতে প্রায় ১৫-২০ দিন সময় লাগে। বেড তৈরির পর তাতে সারি করে সরাসরি বীজ বোনা যায়। আবার বল বা বিড়ায় তৈরি করা চারা নির্দিষ্ট দূরত্বে বেডে রোপণ করা যায়। আদা, হলুদ, কচু প্রভূতি ফসল সরাসরি রোপণ করা যায়। চারা ৫-৬ ইঞ্চি হলে এবং শিকড়ের মাথা বল থেকে বের হলেই (কালো হওয়ার আগেই) বেডে লাগাতে হবে। বিড়া বা ব্যাগের চারা একত্রে বেডে নির্দিষ্ট পরিমাণ গর্ত করে রোপণ করতে হবে। বিড়ার আকার ছোট হলে পার্শ্বে পচা কচুরির আস্তরণ দিতে হবে। নতুন আস্তরণের সঙ্গে ১-২ চা চামচ জৈব সার প্রয়োগ করলে চারা তাড়াতাড়ি বাড়বে। চারা লাগানোর পর সামান্য পানি দিয়ে চারা ও চারার গোড়া ভিজিয়ে দেওয়া আবশ্যক। চারা বেশি লম্বা হলে বাউনি দিতে হবে। অধিক ফলন পাওয়ার জন্য ভাসমান বেডে ঢ্যাঁড়শ, টম্যাটো, বেগুন, কলমিশাক ইত্যাদি ফসলের সঙ্গে আন্তফসল ও মিশ্র ফসল হিসেবে ঝিঁঙে, লালশাক, পুঁইশাক, ধনিয়া, ডাঁটা প্রভৃতি চাষ করা যায়।
এ বিষয় নাজিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইশরাতুন্নেসা এশা জানান, এ উপজেলার বিলাঞ্চলে ভাসমান বেডে কৃষি সবজি উত্পাদনের সুনাম দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ভাসমান বেডে সবজি উত্পাদনকারী কৃষকদের প্রশিক্ষণসহ আর্থিক সহযোগিতা করা হয়।