ইউরোপের নাম শুনলেই আমরা মনে করি বরফের দেশ। ঠান্ডাই সেখানে প্রধান। ইউরোপে যাওয়ার আগে সবাই শীতের পোশাকটি কিনতে ভোলে না। কিন্তু পরিস্থিতি কিছুটা হলেও পালটেছে। এখন ঠান্ডার অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ইউরোপে বিভিন্ন দেশ দাবদাহে পুড়ছে। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। গ্রীষ্মকাল এগিয়ে আসছে, কমছে শীতকালের আয়ু। ফলে একদিকে তাপপ্রবাহ যেমন বাড়ছে, তেমনি ঠান্ডার মাত্রাও কমছে দ্বিগুণ গতিতে। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, বিশ্ব এখন চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার কবলে। এর ফলে একটি অঞ্চলে যখন বন্যায় ভেসে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময় অন্য অঞ্চলে তীব্র গরমে অতিষ্ঠ মানুষ।
ইউরোপে বাড়ছে দাবদাহ : ইউরোপে টানা ৯ মাস শীতের পর মূলত জুন থেকে শুরু হয় গ্রীষ্মকাল। পরিবেশ দূষণে আজ যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন, তা থেকে উত্তর ইউরোপের পরিবেশবান্ধব খ্যাত নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ডও ছাড় পাচ্ছে না। কয়েক বছর ধরে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার এই দেশগুলোর শীতকাল (সেপ্টেম্বর থেকে মে) ছোট হয়ে গ্রীষ্মকাল শুরু হয়ে যাচ্ছে আগেভাগে এপ্রিল-মে থেকেই। গ্রীষ্মকালে ইউরোপের দক্ষিণাঞ্চলীয় অপেক্ষাকৃত উষ্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও গ্রিসে এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার অকল্পনীয়! অন্যদিকে উত্তর ইউরোপের ‘বরফ অঞ্চল’ বলে খ্যাত স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোতে উষ্ণতা বৃদ্ধির হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। হাড় কাঁপানো শীতের দেশ সুইডেনে শীতকালের তাপমাত্রা মাইনাস ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসও হয়ে থাকে।
ইতালির রোমে কাল মঙ্গলবার তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। ইউরোপে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ২০২১ সালের আগস্টে। সে সময় তাপমাত্রা ছিল ৪৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই তাপমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আবহাওয়াবিদদের। সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সরকার। রোম, ফ্লোরেন্স ও বোলোগনাসহ ইতালির ১৬টি শহরে দাবদাহের ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে। দাবদাহের সময় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি প্রলম্বিত হচ্ছে। রাতে তাপমাত্রা বেশি থাকছে।
ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (ইএসএ) বলছে, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও পোল্যান্ডসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। গত শুক্রবার ও শনিবার গ্রিসের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। বন্ধ রাখা হয় জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা অ্যাক্রোপলিস। দাবানলের আশঙ্কা করা হচ্ছে। ক্রোয়েশিয়ায় তীব্র দাবদাহে দাবানল দেখা দিয়েছে। আরেকটি দাবদাহ আসতে থাকায় চলতি সপ্তাহে ইউরোপের তাপমাত্রা বেশি থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলে, ইতালির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ও সম্ভবত গ্রিসের তাপমাত্রা ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গিয়ে দাঁড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গত সপ্তাহের শেষ দিকে তীব্র দাবদাহের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। গত শুক্রবার জারি করা এই সতর্কতার আওতায় ছিলেন ১১ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন নাগরিক, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ফ্লোরিডা থেকে টেক্সাস ও ক্যালিফোর্নিয়ার পাশাপাশি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্য পর্যন্ত এই সতর্কতা জারি করা হয়। আগামী কয়েক দিন প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার কবলে পড়তে পারেন বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। জুনের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) বিজ্ঞানীরা বলেছেন, পূর্বাভাস অনুযায়ী ‘এল নিনো’ জলবায়ু পরিস্থিতি শুরু হয়ে গেছে। এতে আবহাওয়া ও তাপমাত্রা চরম রূপ ধারণ করতে পারে।
ইইউতে ৬২ হাজার প্রাণহানি : ইউরোপের ইতিহাসে ২০২২ সালের গ্রীষ্মকাল ছিল সবচেয়ে উষ্ণ। বিভিন্ন দেশে আগের সব রেকর্ড ভাঙে ঐ সময়ের তাপপ্রবাহ। তীব্র গরমে এ মহাদেশে ৬১ হাজার ৬৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। গত বছরের ৩০ মে থেকে ৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এসব মৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে সবেচেয়ে বেশি ইতালিতে (১৮ হাজার), স্পেনে ১১ হাজার এবং জার্মানিতে ৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ইউরোপের ১০টি দেশের মৃত্যুর হিসাবে দেখা গেছে, মারা যাওয়ার তালিকায় নারীরাই বেশি।
নেচার মেডিসিন জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, গেল গ্রীষ্মে ফ্রান্সে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালের গ্রীষ্মে গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ২ দশমিক ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের বছরের তুলনায় ২০২২ সালের গ্রীষ্মের গড় তাপমাত্রা সুইজারল্যান্ডে ২ দশমিক ৩০ ডিগ্রি, ইতালিতে ২ দশমিক ২৮ ডিগ্রি ও হাঙ্গেরিতে ২ দশমিক ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে।
কেন এই পরিস্থিতি : সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএমও) ২০২২ সালের তাপপ্রবাহ নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। রিপোর্টে তাপপ্রবাহের পাশাপাশি বিশ্ব উষ্ণায়ন সংক্রান্ত আরো নানা তথ্য উঠে এসেছে। জানা যায়, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন এবং নাইট্রাস অক্সাইড এই তিন গ্রিন হাউজের পরিমাণ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। সব মহাদেশেই গত কয়েক বছরে বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহের সংখ্যা বেড়েছে। সঙ্গে রয়েছে আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা। যার জেরে কৃষিকাজের ক্ষতি হয়েছে বিস্তর। বিশ্ব উষ্ণায়ন বিভিন্ন এলাকার গড় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে বলেও জানা গিয়েছে ঐ রিপোর্টে।
গবেষণায় হতবাক করে দেওয়া তথ্য দেখা পাওয়া গেছে। ১৮৫০-১৯০০-এই সময়কালে যে গড় তাপমাত্রা ছিল তার থেকে এখনকার গড় তাপমাত্রা ১.১৫ ডিগ্রি বেড়ে গেছে। ডব্লিউএমও বলেছে, পৃথিবী জুড়ে জনসংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে গ্রিনহাউজ গ্যাসও। আর এই গ্যাসের বৃদ্ধি পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলছে। খরা, বন্যার ঘটনা বাড়ছে। আবহাওয়া পরিবর্তেনের জেরেই পূর্ব আফ্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে খরা হচ্ছে, আবার পাকিস্তানের মতো দেশে ভয়াবহরকম বন্যার ঘটনা ঘটছে। পরিবেশের এই পরিবর্তন খাদ্যনিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে, বাড়ছে উদ্বাস্তু সমস্যা। নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়েছে, উচ্চ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপে গ্রীষ্মকালে গড়ে ৬৮ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হবে। ২০৪০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ৯৪ হাজারে পৌঁছাবে। ২০৫০ সালে সেই সংখ্যা এক লাখ ২০ হাজারে গিয়ে পৌঁছাবে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাড়তেই থাকবে গরম : চলতি বছর এবং আগামী বছরে পৃথিবীর তাপমাত্রা রেকর্ড হারে বৃদ্ধি পাবে বলে জানা যাচ্ছে। কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এল নিনো ফিরছে। আবহাওয়ার বিভিন্ন মডেল দেখে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, প্রশান্ত মহাসাগরে লা নিনা পরিস্থিতির পর এল নিনো এবার ফিরছে। লা নিনা পরিস্থিতির ফলে তাপমাত্রা কমে, আর এল নিনোর ক্ষেত্রে তাপমাত্রা বাড়ে। দক্ষিণ আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব উপকূলবর্তী দেশগুলোতে এল নিনো ঘটে। এর ফলে মহাসাগরের জলস্তরের তাপমাত্রা ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ে। এর ফলে উপকূল এলাকার বায়ুমণ্ডল গরম হয়ে ওঠে। প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্ত থেকে গরম জলের স্রোত মহাসাগরের পূর্ব দিকে ধেয়ে যায়। পূর্ব উপকূলের গরম জল তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় মহাসাগর-সংলগ্ন স্থলভাগের বিভিন্ন দেশের। গরমের ফলে আর্কটিক সাগরের বরফ গলছে যার প্রভাবও বিশ্বে পড়ছে।