কথায় আছে—‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’। ইহার ব্যত্যয় ঘটিলে তাহার ফলাফলও ভালো হয় না। যখন শিশুরা বইখাতা লইয়া স্কুলে যাইবে, বল লইয়া মাঠে খেলিবে, শৈশব-কৈশোরের উচ্ছলতায় মাতাইয়া তুলিবে জীবন ও জগত্, তখন তাহারা স্বাভাবিক মানুষ হইয়া গড়িয়া উঠিবে; কিন্তু ইহার বিপরীত চিত্র একটি আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য লজ্জার। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদন বলিতেছে, গত ১০ বত্সরে দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা বাড়িয়াছে ৭৭ হাজার ২০৩ জন। দেশে এখন শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ১৭ লাখ ৭৬ হাজার ৯৭ জন—যাহা ২০১৩ সালে ছিল ১৬ লাখ ৯৮ হাজার ৮৯৪ জন।
শিশুশ্রমের ১০ বত্সরের এই অবনমনের চিত্র কীসের ইঙ্গিত দেয়? ইহা এই ইঙ্গিত দেয় যে, আমরা দেশটাকে এখনো শিশুদের জন্য বাসযোগ্য করিয়া তুলিতে পারি নাই। বরং পরিস্থিতি আরো প্রতিকূল হইয়াছে বিধায় শিশুরা আরো অধিক শিশুশ্রমে অংশ লইতে বাধ্য হইতেছে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, এই দেশকে সকল শিশুর বাসযোগ্য করিতে হইলে আমাদের প্রতিটি শিশুর মৌলিক চাহিদা—অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাটা সকলের পূর্বে জরুরি; কিন্তু বিধিবাম। সকল মৌলিক চাহিদা দূরের কথা, ন্যূনতম চাহিদাও যদি আমরা মিটাইতে পারিতাম, তাহা হইলে বিগত ১০ বত্সরের শিশুশ্রমের চিত্র আরো খারাপ হইত না। সবচাইতে দুঃখজনক বিষয় হইল, বহু ক্ষেত্রেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করিয়া অসংখ্য শিশু অকালে তাহাদের জীবনীশক্তি হারাইয়া ফেলিতেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও ইউনিসেফ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গিয়াছে, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে প্রায় ৩০১ ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিশুরা বিরামহীনভাবে শ্রম দিয়া যাইতেছে। কুলিগিরি, হকারি, রিকশা চালনা, পতিতাবৃত্তি, ফুল বিক্রি, আবর্জনা সংগ্রহ, ইট-পাথর ভাঙা, হোটেলে শ্রম, মাদকদ্রব্য বহন, ঝালাই কারখানায় শ্রম ইত্যাদি কাজে শিশুদের নিয়োজিত করা হয় অত্যধিক। এমনকি রাজধানীর অনেক শিশু মাদকাসক্ত। তাহাদের অনেকেই ক্ষুধা তাড়াইতে প্লাস্টিকের মধ্যে আঠার গন্ধ শুঁকিয়া নেশা করে। চোখ-কান খোলা রাখিলেই যে-কেহ ঢাকা শহরের রাস্তার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে এই চিত্র দেখিতে পাইবেন।
শিশুশ্রম মূলত দারিদ্র্যেরই ফল। সংসারের অভাব-অনটনের কারণেই একটি শিশুকে অল্প বয়সে শ্রমিকের কাজ করিতে হয়। খোঁজ লইলে দেখা যাইবে, অধিকাংশ শিশু শ্রমিকের জীবনের গল্প অকল্পনীয় হূদয়বিদারক। অসচেতনতা ও শিক্ষা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান না থাকিবার দরুন দরিদ্র বাবা-মা তাহাদের শিশু সন্তানকে আয়-রোজগারের পথে নামাইয়া দেন। এইভাবে তারা নিজেরাই নিজেদের শিশুকে আদর-সোহাগের পরিবর্তে শ্রমিক বানাইয়া তোলে। মা অথবা বাবাহারা কিংবা এতিম শিশুদের বিপদ আরো অধিক। মনে রাখিতে হইবে, শিশুশ্রমে জড়াইয়া পড়িলে একটি শিশু তাহার বুদ্ধিবৃত্তিক, আবেগগত, সামাজিক ও নৈতিক জীবন হারাইয়া ফেলে। তাহাদের জীবনটা বিষাইয়া উঠে। তাহাদের মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয় এবং তাহারা হইয়া উঠে অপরাধপ্রবণ। তখন তাহারা বড় হইয়া সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, আমাদের দেশের শিশুদের শ্রমিক হওয়ার পিছনে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাও অনেকাংশে দায়ী। স্কুলের পড়ালেখা অবৈতনিক হইলেও সেইখানে পড়াশোনার পরিবেশের মধ্যে আনন্দ বা উত্সাহ খুঁজিয়া পায় না সকালে না খাইয়া আসা দরিদ্র শিশুটি। অতি দরিদ্র মা-বাবা মনে করেন, স্কুলে পাঠানো সময়ের অপচয়, বরং সেই সময়ে তাহাদের শিশু কোথাও কাজ করিয়া সংসারের বোঝার ভার কমাইতে পারিবে। আর শিশুটিও কাঁচা টাকা ও স্বাধীনতা পাইয়া অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকের জীবনটা মানাইয়া লয়। সুতরাং শিশুশ্রম বন্ধ করিতে হইলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনিতে হইবে। শিক্ষার আনন্দদায়ক পরিবেশ এবং স্কুলে যাওয়া দরিদ্র শিশুদের পরিবারের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা যাইতে পারে, যাহাতে তাহারা বুঝিতে পারে স্কুলে না গেলে তাহাদের কোনো লাভই হইবে না, বরং আর্থিক ক্ষতি হইবে। ইহার সহিত শিশুশ্রম প্রতিহতে আমাদের এই সংক্রান্ত আইনগুলো আরো কঠোর করা প্রয়োজন।