দৃকে রানা প্লাজা শীর্ষক প্রদর্শনী

‘নির্মম ঘটনাটি সবাই ভুলে যেতে চাইছে’

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর দেশের শ্রমিকদের জীবনমানের কী কোনো উন্নয়ন ঘটেছে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আলোকচিত্রী ইসমাইল ফেরদৌস এক বিশাল নীরবতা খুঁজে পেয়েছেন। সে নীরবতা দেখা যায়, দেশের গার্মেন্টস মালিকদের কাজে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের পোশাক ক্রেতাদের কর্মকাণ্ডে, দেশের রাজনৈতিক দল এবং মানুষের ভাবনাতেও নেই সেই ট্র্যাজেডির কথা। সেই ট্র্যাজেডি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে দেখা যাচ্ছে না কোনো পক্ষকেই। এমন সব প্রশ্নই জন্ম দিয়েছে দৃক গ্যালারিতে শুরু হওয়া প্রদর্শনীতে। গতকাল শুক্রবার বিকালে শুরু হয়েছে ‘রানা প্লাজার দশ বছর’ শীর্ষক প্রদর্শনী।

আলোকচিত্রী ইসমাইল ফেরদৌস বলেন, আমি রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির সময় টানা এক মাস ছবি তুলেছি। এরপর প্রদর্শনী, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ, নানা কাজ করেছি। এর ১০ বছর পর দেশে ফিরে আবারও সেই বিষয়ে ছবি তুলতে গিয়ে এটাই উপলব্ধি করেছি যে, সবাই সেই ভয়াবহ নির্মম ঘটনাটিকে ভুলে যেতে চাইছে।

আলোকচিত্রী ইসমাইল ফেরদৌসের রানা প্লাজা ও শ্রমিকদের বহু ছবি বিশ্বের বহু নামি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এমন কিছু আলোকচিত্র নিয়ে শুরু হয়েছে এ প্রদর্শনী। আলোকচিত্র ছাড়াও পোস্টার, প্রামাণ্যচিত্র আর বিশেষ কাঠামো নির্মাণের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে সেই ট্র্যাডেজির কথা অনুভব করাতে চাইছেন শিল্পী। সেই সঙ্গে প্রদর্শনীর চত্বরে ভ্রমণের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে জাগরণের ডাকও দিয়ে যাচ্ছে প্রদর্শনীটি।

প্রর্দশনীর উপস্থাপনা একেবারেই ভিন্ন। এই প্রদর্শনীতে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে মূলত দর্শকদের অনুভূতিকে নাড়া দিতে। এখানে প্রবেশ করলে মনে হবে আপনি হারিয়ে যাচ্ছেন। অন্ধকার, লাশের ছবি, উদ্ধার তৎপরতা—এগুলো একের পর এক সামনে আসবে দর্শকের। যতটা দম বন্ধ পরিস্থিতির উপলব্ধি দেওয়া সম্ভব, সেই চেষ্টাই করা হয়েছে। নিখোঁজ শ্রমিকদের সংবাদে ছেয়ে থাকা দেওয়াল পেরিয়ে সামনে এগোলে একটি সারণি পাওয়া যায়। সেখানে দুর্ঘটনায় হতাহত শ্রমিকদের সংখ্যা, দুর্ঘটনা পরবর্তী দিনগুলোতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সাজানো হয়েছে গণমাধ্যমের সূত্রে। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে উদ্ধাররত শ্রমিকদের দেখা পাওয়া যায় কয়েকটি দেওয়াল জুড়ে সাঁটানো বৃহত্ পোস্টারে। পুরো প্রদর্শনী ঘুরে বের হলে ঘটনার ভয়াবহতার উপলব্ধি ঘটবে যে কারো।

ইসমাইল ফেরদৌস বলেন, প্রদর্শনীটি অনুভব করার। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে তার সুবিধাবাদী ঘেরাটোপকে বেরিয়ে আসার তাগাদা রয়েছে।

প্রদর্শনীর উপযোগী করে গ্যালারির অবকাঠামো নির্মাণ করেছেন স্থপতি ফারহানা নিজাম চৌধুরী। প্রদর্শনীর জন্য বিশেষ এই অবকাঠামো নির্মাণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ছবিগুলো তোলার সময় আলোকচিত্রীর নিজের অবস্থা, উদ্ধারকর্মী ও তাদের কর্মকাণ্ড, ধ্বংস স্তূপ, লাশের গন্ধ, স্বজন হারানোদের বেদনা—সব মিলিয়ে দম বন্ধ পরিবেশ-পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তখন।

আলোকচিত্রী ইসমাইল ফেরদৌস পেশাজীবনে দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, জিও ম্যাগাজিন, দি ওয়াশিংটন পোস্ট, লা মন্দ এম ম্যাগাজিন এবং হার্মিসসহ বহু আন্তর্জাতিক পত্রিকা ও সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেছেন। ২০১৭ সাল থেকে তিনি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনে বিভিন্ন বিষয়ে চ্যালেঞ্জিং গল্পের জোগান দিয়ে চলেছেন। বর্তমানে তিনি প্যারিসে অবস্থিত এজেন্স ভু’ প্রতিষ্ঠানের একজন সদস্য হিসেবে কর্মরত আছেন। ইসমাইল ফেরদৌস তার অনবদ্য কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো-পিকচার অব দি ইয়ার (ইন্টারন্যাশনাল), আলেক্সিয়া  ফাউন্ডেশন গ্রান্ট, গেটি ইমেজেস ইনস্টাগ্রাম গ্রান্টসহ আলোকচিত্র জগতের বহু সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

প্রদর্শনীটি একুশ শতকের আন্তর্জাতিক নারী পোশাক শ্রমিক ইউনিয়ন হেরিটেজ ফান্ডের আংশিক অর্থায়নে এবং বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কারস সলিডারিটির সহযোগিতায় আয়োজন করা হয়েছে। ২৯ জুলাই পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে প্রদর্শনী।