চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিখোঁজ কেন?

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিন গ্যাংকে দীর্ঘদিন জনসমক্ষে দেখা যাচ্ছে না। যা নিয়ে অনলাইনে নানা ধরনের জল্পনাকল্পনা দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে এ বিষয়টি আবারও চীনের সিক্রেসি বা গোপনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ৫৭ বছর বয়সি কিন গ্যাংকে প্রায় এক মাস জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তার সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল গত ২৫ জুন। গত ডিসেম্বরে মন্ত্রী মনোনীত হওয়ার সময় তাকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী বলেই মনে করা হচ্ছিল। এক জন শক্ত কূটনীতিক হিসেবে পরিচিত হলেও কিন চীনের ‘নেকড়ে যোদ্ধা’ স্টাইলের কূটনীতি থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে চলছিলেন। চীনা সরকারের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর এক জন হিসেবে কিনের দীর্ঘ অনুপস্থিতির ওপর শুধু কূটনীতিক বা চীন পর্যবেক্ষকরাই দৃষ্টি রাখছেন না বরং সাধারণ চীনা জনগণেরও দৃষ্টি আছে। 

গত সপ্তাহে তার অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং জানান যে, এ সম্পর্কে তার কাছে দেওয়ার মতো কোনো তথ্য নেই। চীনের অস্বচ্ছ সিস্টেমের মধ্যে এ ধরনে হাই-প্রোফাইল এক জন কর্মকর্তার এমন অন্তর্ধান একটি জটিলতার লক্ষ্মণ হতে পারে। একই সঙ্গে মুখপাত্রের জবাব এ বিষয়ে জল্পনা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এ বিষয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি করেছে।

বিবিসির এক খবরে বলা হয়েছে, চীনে কোনো ধরনের ব্যাখ্যা ছাড়াই উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের এমন হুটহাট নিখোঁজ হয়ে যাওয়া নতুন কিছু নয়। পরে অনেক সময় দেখা যায়, তারা অপরাধ তদন্তের আওতায় রয়েছেন। আবার অনেক সময় তারা অন্তর্ধানে যান ও পরে ফিরে আসেন জনসমক্ষে। কিন্তু দৃশ্যপটের বাইরে থাকার কারণ সম্পর্কে তারা কিছু বলেন না। শি জিনপিং নিজেও ২০১২ সালে চীনের নেতা হওয়ার আগে প্রায় দুই সপ্তাহ জনসমক্ষে আসেননি। তখন তার স্বাস্থ্য এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের বিষয় আলোচনায় এসেছিল। তবে পার্টির উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে কিন একজন যিনি দীর্ঘসময় ধরেই অনুপস্থিত।

গত সপ্তাহে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা দেয় যে, কিন গ্যাং স্বাস্থ্যগত কারণে ইন্দোনেশিয়ায় কূটনীতিকদের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারবেন না। কিন্তু পরে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে এ লাইনটুকু সরিয়ে ফেলা হয়। কিনের পরিবর্তে তার পূর্বসূরি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ফরেন এফেয়ার্স কমিশনের পরিচালক ওয়াং ই সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফরেন পলিসি বিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেলের বৈঠকও পেছানো হয়েছে। তবে এজন্যও কোনো কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি। এ বিষয়ে তথ্যের ঘাটতির কারণেই গুম, খুনের জল্পনাও উঠে আসছে।

কিনের নিখোঁজ হওয়ার রহস্য কী? অনলাইন ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে সব তত্ত্ব প্রচার হচ্ছে তার মধ্যে আছে কিনকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক খবরে বলা হয়েছে, সম্ভবত এক সাংবাদিকের সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েই জনসমক্ষে আসছেন না কিন। হংকংয়ের ফোনিক্স টিভির সাংবাদিক ফু শিয়াওতিয়ানের সঙ্গে কিন গ্যাংয়ের সম্পর্ক রয়েছে বলে বহু জায়গায় দাবি করা হচ্ছে। তাদের একসঙ্গের ছবিও টুইটারে আসে। তবে গোটা ঘটনা ঘিরে উঠছে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে আসা সন্তানের প্রসঙ্গ। যে সন্তান মার্কিন নাগরিক বলেও জানা যাচ্ছে। এ নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি কিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আবার গুজব আছে কিনের স্ত্রী এ ঘটনায় প্রেসিডেন্ট শির কাছে নালিশ করেছেন। এ অবস্থায় বউয়ের ভয়েই প্রেয়সীকে নিয়ে উধাও হয়েছেন কিন গ্যাং।

দেশের জনতার সামনে এই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা চীনের কমিউনিস্ট সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আর সেই আশঙ্কাতেই কিনের সঙ্গে কমিউনিস্ট সরকার কথা বলছে বলে জানা যাচ্ছে। যদিও এসব গুজব সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও।

বেইজিংভিত্তিক চীনা রাজনীতির বিশ্লেষক উ কিয়াং বিবিসিকে বলেন, জনগণের এ নিয়ে উত্সাহ আছে, কারণ ব্ল্যাক বক্সের গোপনীয়তা নিয়ে তারা কৌতূহলী। তার অন্তর্ধান চীনা কূটনৈতিক সিস্টেম এবং উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার ভঙ্গুতাকেই তুলে ধরছে। সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইয়ান চং বলেন, চীনা সিস্টেমের কারণে এটি বলা কঠিন যে এখন কিন কি কোনো সমস্যায় আছেন নাকি আবার তিনি জনসমক্ষে ফিরে আসতে পারবেন। যদিও তিনি বলেন যে, সত্যি হলো এমন একজন সিনিয়র কর্মকর্তা সম্পর্কে ওঠা গুজবগুলো নিয়ে চীনের অনলাইনে আলোচনা হচ্ছে কোনো সেন্সরশিপ ছাড়াই, যা কিছুটা অস্বাভাবিক। সেন্সরশিপের অনুপস্থিতিটাই মানুষকে ধারণা দেয় যে, ক্ষমতার লড়াই, দুর্নীতি, ক্ষমতা ও পদের অপব্যবহার এবং রোমান্টিক সম্পর্ক নিয়ে যে সব গুজব তার কিছুটা সত্যতা থাকলেও থাকতে পারে।