সামরিক জান্তার জাঁতাকলে পড়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র যখন মৃতপ্রায়, মানুষের বাক ও বৌদ্ধিক স্বাধীনতা যখন প্রায় অস্তিত্বহীন, মানুষ যখন শোষণ-নির্যাতন-নিপীড়নে নিষ্পেষিত, তখন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা নিরাপদ বিদেশজীবন ছেড়ে জীবন সংহারের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে এসে মানুষের মুক্তি ও ঘুণে ধরা সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। এ সময় তিনি সংবাদপত্রের সাক্ষাত্কারে বলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি তো নিতেই হবে। মৃত্যুভয়ে ভীত মানুষের কোনো গৌরব নেই।...দেশে ফিরে আমার অন্যতম প্রধান কাজ হবে দেশের সমগ্র জনগণের পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুজ্জীবিত করা’ (নিউজ উইক, ১৯৮১, ১১ মে)। এভাবে তিনি মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য নিরলস কাজ শুরু করেন। আর এতেই পিলে চমকে দিয়েছিল দেশবিরোধীদের।
তার শক্তি হচ্ছে দেশের মানুষের প্রতি আত্মত্যাগ, মমত্ববোধ, মুক্তির সংগ্রামে দৃঢ়প্রত্যয়। তাই তো দেখি তার জীবনের ওপর একের পর এক আঘাত আসছে। গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন থেকে তাকে নিবৃত করার জন্য ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি চোখ বেঁধে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে তাকে মৃত্যুর ভয় দেখানো হয়, কিন্তু তিনি দমে যাননি। ১৯৮৪ সালের ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের জনসভায় তাকে হত্যার জন্য বোমাবাজি করা হয়, ১৯৮৮ সালে লালদিঘির ময়দানে স্বৈরাচারবিরোধী জনসভায় নির্বিচারে পুলিশ গুলি চালায়, ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট তার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য দেশবিরোধী অপশক্তি শতাব্দীর ন্যক্কারজনক গ্রেনেড হামলা চালায়, যেখানে ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে গেলেও ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন। এভাবে তিনি নিজ জীবনের পরোয়া না করে মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিজেকে সঁপে দেন।
তিনি এমন এক মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চান, যেখানে দলমত-নির্বিশেষে সবাই প্রকৃত স্বাধীনতা উপভোগ করবে। আর তার এই উদ্দেশ্যই হচ্ছে স্বার্থান্ধ গোষ্ঠীর প্রতিবন্ধক। এজন্যই তার ওপর বারবার এসেছে ঘৃণ্য হামলা। একটা সময় বিপ্লব বলতে কেবল সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যেমে সমাজে পরিবর্তন ঘটানোকে বোঝানো হতো। তবে সোভিয়েত কমিউনিজমের পতন সেই ধারণায় আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। একজন ভিশনারি নেতা তার অনুসারীদের নিয়ে সমাজ পরিবর্তনে অহিংস বিপ্লবী ভূমিকা পালন করতে পারেন, আর এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত জননেত্রী শেখ হাসিনা। সামাজিকভাবে মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তনের ধারার সূচনা করাই একজন আধুনিক বৈপ্লবিক নেতার মূল কাজ। এক্ষেত্রে তিনি তার অনুসারীদের নিয়ে সমাজে পিছিয়ে পড়া, বঞ্চিত, অবহেলিত, নিষ্পেষিত মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য মৌলিক অধিকার পূরণে বাস্তবায়ন করে চলছেন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রকল্প, সাক্ষরতা প্রকল্প, কর্মসংস্থান প্রকল্পসহ নানামুখী যুগোপযোগী পদক্ষেপ। তিনি দেশ ও মানুষকে ভালোবেসে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা, শৃঙ্খলমুক্তি, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানোর জন্য নিরলস সংগ্রামে অবিচল পথ কেবল হেঁটেই চলছেন না, তিনি মানবিকতা, ঔদার্যতা দিয়ে তাদের জীবনে বইয়ে দিচ্ছেন শান্তির সুবাতাস।
তিনি পারিবারিক কারণে খুব কাছ থেকে দেখেছেন বাংলার জনসাধারণের অবস্থা, দেখেছেন মানুষের বঞ্চনা, দেখেছেন শোষণের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম, যা তার মনোজগতে সৃষ্টি করেছিল বিপ্লবী মানসিকতার। তাই তো দেখা যায় স্কুলে পড়া অবস্থায় মাত্র ১৫ বছর বয়সেই তিনি জড়িয়ে পড়েন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন স্বৈর সামরিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে পালন করেন সক্রিয় ভূমিকা। রাজপথে আইয়ুববিরোধী গণ-আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ তার প্রতিবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ। গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে ক্ষমতা ও শক্তির ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করার ওপরই একজন বিশ্বনেতার প্রকৃত স্বরূপ ফুটে ওঠে। এদিক দিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা অনন্য। তিনি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন ও উন্নয়নের ধারাকে উপলব্ধি করেই ঘোষণা করেছেন বাঙালি জাতির নব্য মুক্তির সনদ ভিশন-২০২১, যার মূল প্রয়াস হলো ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন। এই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার দিকে বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে বহু দূর। এখন ঘোষণা করা হয়েছে ২০৪১ সালের স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয়। ভিশনারি লিডারশিপ আর মিশনারি অ্যাটিচুডই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও মানবিকবাদের পক্ষে অবস্থান নেওয়া একজন বিশ্বনেতার সব বৈশিষ্ট্য তার মধ্যে বিদ্যমান।
দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘তার নেতৃত্বের অসাধারণ গুণ হলো নিপীড়িত, বঞ্চিত, দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো। শেখ হাসিনার মানুষের প্রতি ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করেছে।’ জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বিশ্বমানবতার জন্য অনন্য ও প্রয়োজনীয়। তিনি বিশ্ব মানবতার কণ্ঠস্বর।’ এ বিষয়ে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘বিপুল জনপ্রিয় নেত্রী হলেও তিনি আসলে সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র্র মানুষের কণ্ঠস্বর।’
তিনি ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে সারা দেশে শান্তি স্থাপনের প্রচেষ্টা করেন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার আধার পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মধ্যকার বিরোধের সুন্দর সমাধানের জন্য করেন পার্বত্য শান্তিচুক্তি। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে পার্বত্য এলাকায় বসবাস করা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর স্বতন্ত্র জাতিসত্তা এবং বিশেষ মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তার আহ্বানে বিদ্রোহীরা স্বেচ্ছায় অস্ত্র জমা দেন। এর ফলে থমথমে পার্বত্য চট্টগ্রামে নেমে আসে শান্তির সুবাতাস, যা অন্য কোনো সরকার করতে পারেনি। বিশ্বশান্তির ক্ষেত্রেও এই চুক্তি অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। গ্রেট ব্রিটেনের উত্তর আয়ারল্যান্ডে এ রকম সমস্যা চলছিল। বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সঙ্গে বিরোধের জন্য ঐ এলাকার উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়েছিল। ইংল্যান্ডের সরকার এই অবস্থা থেকে উত্তোরণের পথ খুঁজছিল। বাংলাদেশের শান্তিচুক্তি তাদের অনুপ্রাণিত করে। ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ও ছিটমহল সমস্যার সমাধানসহ অসংখ্য পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখছেন, সৃষ্টি করছেন শান্তিময় পরিবেশ।
তিনি তার লেখা বই ‘ওরা টোকাই কেন’ (১৯৮৯)তে লিখেছেন, ‘কত তাজা প্রাণ রাজপথে বুকের রক্ত দিয়ে লিখে যাচ্ছে—এই সমাজ বদলে দাও, আমরাও মানুষ, বাঁচার মতো বাঁচতে চাই, ক্ষুধা-দারিদ্র্য থেকে মুক্তি চাই।’ তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব দৃঢ়চেতা মনোভাবে মৃত্যুভয়কে জয় করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মানুষের মাঝে পুনরুজ্জীবিত করা, বঙ্গবন্ধুর আর্দশকে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সর্বোপরি, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবিলা, বৈশ্বিক সন্ত্রাস মোকাবিলা, নারী ও শিশুর অভাবনীয় উন্নয়ন, গুণগত শিক্ষার প্রসার, উন্নয়নে বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব ইত্যাদি বিষয়ে তার অবদান আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এটা তার সুদূরপ্রসারী নেতৃত্বের ফল। তৃতীয় বিশ্বের জন্য এই নেতৃত্বই সবচেয়ে জরুরি।
লেখক: অধ্যাপক ও সহকারী প্রক্টর, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়